📮 রাগ উঠলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না

💌 মনচিঠি-০৬ (টেক্সট)

আমি কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট একজন মেয়ে। মূলত দুইটা ঘটনার পর থেকে আমার সমস্যা গুলো শুরু হয়।

প্রথম ঘটনাঃ

আমার আম্মু মারা যায় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝের দিকে। তো আম্মু মারা যাবার পর থেকে আমার কিছু সমস্যা শুরু হয়। সমস্যা গুলো হচ্ছেঃ
১. আমার মনে হতে থাকে আমি বাকিদের মত না।
২. সন্ধ্যার দিকে আর রাত ১১ টার পর থেকে প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
৩. স্যোশাল মিডিয়া তে কারো সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে।
৪. খুব ডিপ্রেসড থাকি, কোনো কাজের মোটিভ পাই না।
৫. সারাটা দিন বিছানাতেই থাকি খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই।
৬. কারো সাথে মিশি না একা একা থাকি।
৭. বাসার প্রায় সবার সাথে মেজাজ খারাপ থাকলে রুড টোনে কথা বলি।
৮. কাউকে খুব হ্যাপি দেখলে হিংসা হয় যা আগে একটুও ছিল না।

দ্বিতীয় ঘটনাঃ

আমার সাথে আমার বয়ফ্রেন্ডের রিলেশন ৩ বছরের। এটাই আমার প্রথম রিলেশন। মার্চ মাসের শেষের দিকে আমার বয়ফ্রেন্ড কে আমি যাদের সাথে কথা বলতে মানা করতাম তার সাথে কথা বলতো এটা জানতে পারি আর মে মাসের শুরুতে ওর একটা ফেইক আইডি আছে তাও জানতে পারি যা দিয়ে ও অন্য মেয়েকে এবং ওর এক্সকে মেসেজ দিতো। এসব জানার পর আমি ওর ফেসবুক পাসওয়ার্ড নিই। ফেসবুক পাসওয়ার্ড নেয়ার পরে আরো জানতে পারি রিলেশনের আগে অন্য একটা মেয়ের সাথে ওর ভাষ্যমতে ১ বার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে এবং রিলেশনের পরেও অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল কিছুদিন। এই ঘটনার পর থেকে আমি আরো অস্থির হয়ে পড়ি। তারপর থেকে যে সমস্যা গুলো হচ্ছেঃ
১. আমার কাউকেই আর বিশ্বাস হয় না।
২. বয়ফ্রেন্ড ১ মিনিটও রিপ্লাই দিতে দেরি হলে আমার মনে হয় ও অন্য কারো সাথে কথা বলছে, স্ক্রিনশট দিলেও তা বিশ্বাস হয় না।
৩. বেশি সময় ধরে অনলাইনে না থাকলে মনে হয় ও অন্য কারো সাথে রুমডেটে গেছে।
৪. অনেক বেশি ওভার থিংকিং করি সবকিছু নিয়ে, ও প্রমাণ দিলেও বিশ্বাস হয় না, মনে হয় আমি যা ভাবি তাই ঠিক।
৫. ওর কৃতকাজের জন্য এগ্রেসিভ লেভেলের প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠি, মনে হয় প্রতিশোধ না নিতে পারলে আমি কোনোভাবেই শান্ত হবো না, আর রাগ উঠলে সমস্ত রাগ ওর উপর নামাই ওর সাথে কড়া কথা বলে ওর কৃতকর্ম ওকে মনে করিয়ে দিয়ে।
৬. কোনোভাবে রাগ উঠলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না, কেউ বুঝালেও বুঝতে চাই না যতক্ষণ না কেউ আমার সাথে কড়া ভাষায় কথা বলে না থামায়।
৭. ও আমাকে ওয়াদা করেছে ও আর এ ধরনের কিছু করবে না এবং শুধরে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না ও শুধরে গেছে বা এরকম কিছু করবে না। তাও নিজেকে জোর করে বুঝানোর চেষ্টা করি ও শুধরে গেছে হয়তো। আর আমি জানি এবং বিশ্বাসও করি যে ও আমাকে ভালোবাসে।
৮. ওর সাথে দেখা করার বা ক্লোজ হবার ইচ্ছা চলে গেছে, ওর প্রতি প্রচণ্ড অবিশ্বাস, রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা জন্মেছে কিন্তু তাও ওর সাথে কথা না বললে ভাল লাগে না তাই সারাদিন প্রায় ওর সাথেই কথা বলি আর এখনো ভালোবাসি।

📮 মনচিঠি টেক্সট-০৬ এর উত্তর

আমি প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই আপনি আপনার সমস্যার কথাগুলো বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখেছেন। আপনি আপনার সমস্যার পেছনে দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রথমে আপনার মায়ের মৃত্যুশোক থেকে আপনার মধ্যে কিছু সমস্যা দেখা দেয়, আপনি বিষন্নতায় ভুগতে শুরু করেন, আপনার কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং আপনার ভাষায় আপনি ধীরে ধীরে ইন্টোভার্ট হওয়া শুরু করেন। পরক্ষণেই কিছুদিন পরে আপনার বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের জটিলতা দেখা দেয়, আপনি আপনার বয়ফ্রেন্ডকে সন্দেহ করা শুরু করেন, আপনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না, এবং আপনার রাগ বেড়ে যায়।

আপনি আপনার যে সমস্যার কথাগুলো বলেছেন এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রধান উপায় হচ্ছে আপনি যদি কোন প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট এর কাছে নিয়মিত কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি কন্টিনিউ করতে পারেন। নিয়মিত কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে আশা করা যায় আপনি আপনার এই সমস্যা থেকে অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এর পাশাপাশি আপনি কিছু কাজ করতে পারেন।

১. আপনি আপনার মায়ের সাথে কাটানো সুখের স্মৃতিগুলো মনে করতে পারেন, আপনি আপনার মায়ের গুনাবলীগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করার মাধ্যমে আপনার মায়ের স্মৃতি নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারেন।

২. আপনি চাইলে মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ কৃতজ্ঞতা নোট লিখতে পারেন।

৩. আপনি বলেছেন আপনি অনেক ইন্টোভার্ট হয়ে যাচ্ছেন, এজন্য আপনি কয়েকটা কাজ করতে পারেন, আপনি আপনার সোস্যাল সাপোর্ট গুলো খুজে বের করতে পারেন, আপনার ঘনিষ্ঠজনদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে পারেন।

৪. আপনি বলেছেন আপনার বয়ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কের জটিলতা চলছে, সম্পর্কের জটিলতা সাধারণত তৈরি হয় ভুল বোঝাবুঝি থেকে, এর জন্য আপনি কিছু কাজ করতে পারেন। আপনার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ইতিবাচকভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন, এবং আপনার ফিলিংস গুলো স্পষ্ট ভাবে তার সাথে শেয়ার করতে পারেন, সেখানে আপনি তাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন তার কোন আচরনের জন্য আপনার কেমন অনুভূতি হয়, এবং এটাকে অন্য কোনভাবে সমাধান করা যায় কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

৫. সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা রাখার চেষ্টা করুন তাহলে সম্পর্কে সন্দেহপ্রবনতা কমে আসবে।

৬. আপনি বলেছেন আপনার রাগ বেড়ে যাচ্ছে, রাগ নিয়ন্ত্রনের জন্য আপনি কিছু কাজ করতে পারেন, যখন বুঝতে পারবেন আপনার রাগ বেড়ে যাচ্ছে, আপনি তখন ধৈর্য্য ধারন করুন, স্থান পরিবর্তন করে অন্য কোথাও চলে যান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে, যেই চিন্তা থেকে রাগ হয়েছে সেটা নিয়ে ভাবতে পারেন, এবং চিন্তা করতে পারেন এটাকে অন্যভাবে ভাবা যেতো কিনা।

৭. যেই চিন্তাগুলো আপনার মধ্যে অস্বস্তি বা অশান্তির সৃষ্টি করছে সেটাকে চেষ্টা করুন অন্যভাবে ভাবা যায় কিনা।

৮. মনকে স্থির করার জন্য রিলাক্সেশন অনুশীলন করতে পারেন।

ধন্যবাদ!

দীপন চন্দ্র সরকার
এসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
এমফিল গবেষক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাবি।
২০-০১-০২, কাউন্সেলর, মনচিঠি, ডিইউওএস
depondu@gmail.com

💌 অনলাইন চিঠি ও উত্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ‘মনচিঠি’তে লিখতে হবে।

📞 ভয়েস কলে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

☎️ হটলাইন নম্বরে ফোন করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল, ফেসবুক পেজ, সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নেয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *