রোগ যখন ভুলে যাওয়া

Dewar Babu মুভিটি দেখেছেন কখনো? খুবই জটিল প্রেমের মুভি। কিন্তু কিছু দূর কাহিনী চলার পরই ‘টুইস্ট’ চলে আসে। মুভির নায়ক এক ভয়ংকর এক্সিডেন্টের শিকার হন এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পান। জ্ঞান ফেরার পর তার প্রথম ডায়লগ ছিলো “আমি কে? আমি কোথায়? আপনারা কারা?” এ কথা শুনে নায়কের আত্মীয়-স্বজন অনেক ব্যথিত হন এবং নায়িকা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন ডাক্তার এসে জানালেন, রোগীর Amnesia হয়েছে।

এসব দৃশ্য দেখে এমন মনে হতেই পারে যে, মাথায় আঘাত পেলে অ্যামনেশিয়া হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর এটা হলে ব্যক্তি তার নাম ঠিকানা ভুলে যায়। নিজের কোনো কাজকর্ম করতে পারে না, আগে যা পারতো তার কিছুই মনে থাকে না।

অ্যামনেশিয়া হলো ভুলে যাওয়া, স্মৃতি বিলোপ, তথ্য ঘটনা, অভিজ্ঞতার হ্রাস পাওয়া। Amnesia is a deficit in memory caused by brain damage or disease, but it can also be caused temporarily by the use of various sedatives and hypnotic drugs. The memory can be either wholly or partially lost due to the extent of damage that was caused. [Source : Wikipedia]

কিন্তু বাস্তবে এভাবে মাথায় আঘাত পেয়ে সব কিছু ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এটি সত্যি যে মাথায় আঘাত পেলে স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী হয়। যেমন: Anterograde Amnesia হলে মানুষ নতুন তথ্য মনে রাখতে পারে না। আবার, Retrograde Amnesia তে দূর্ঘটনার আগের স্মৃতি মনে থাকে না।আর মুভিতে দেখানো সমস্ত স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নাম Transient Global Amnesia (TGA), যা খুবই বিরল একটি অসুখ।

এছাড়া Neurology and Clinical Neuroscience ও Encyclopedia of Neuroscience অনুসারে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মধ্যে বয়স্ক থেকে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই (গড়ে ৪-৬ ঘন্টা) তার স্মৃতি ফিরে পায়। [Source : Google]

রোগের কারণ

বিভিন্ন রোগের কারনে অ্যামনেশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ হতে পারে। যেমন, এইডস, দীর্ঘমেয়াদী ধূমপান ও মদ্যপান, আলকোহল, ভিটামিন বি’এর অভাব, কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া, মস্তিষ্কের রোগ এবং অনৈতিক জীবনযাপন, মস্তিষ্কে আঘাত, স্ট্রোক, ব্রেন টিউমার, মস্তিষ্কে অপর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রবাহ, মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত ইত্যাদি।

লক্ষণ

অ্যামনেশিয়ার প্রাথমিক বিস্তার খুবই ধীরে হয়, এমনকি মাস কিংবা বছর ধরেও হতে পারে। ভুলে যাওয়ার কারণে রোগী হতাশা, নিদ্রাহীনতা ও অন্যান্য সমস্যায় ভোগে এবং আস্তে আস্তে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তবে অ্যামনেশিয়া যে ধরনেরই হোক না কেন, তাতে সাধারণত আমাদের Declarative Memory অর্থাৎ তথ্য ও ঘটনার স্মৃতি, আমাদের Procedural Memory অর্থাৎ কোনো অভ্যাস বা কাজের কৌশলের স্মৃতির চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ কেউ প্রথম কবে, কার কাছে সাইকেল চালানো শিখেছে তা ভুলতে পারে কিন্তু কীভাবে সাইকেল চালাতে হয় তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

সেই সাথে অ্যামনেশিয়া তে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের Long Term Memory, অর্থাৎ ছোটবেলার স্মৃতি। এবং সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যখন স্মৃতি ফিরে আসে, তখন সবার আগে সেই স্মৃতি গুলোই ফিরে আসে।

ভুলে যাওয়া রোগ থেকে মুক্তির কিছু উপায়

কয়েক দিন আগেই হয়ত দেখা হয়েছিল কোন একজনের সঙ্গে। কথাও হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ মনে করতে গিয়েও কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। কোন একটা জিনিস হয়ত খুব যত্ন করে তুলে রেখেছেন কোথাও। কিন্তু কাজের সময় কিছুতেই আর মনে করতে পারছেন না যে কোথায় রেখেছেন। এরকম হতে থাকলেই অনেকে ভয় পান। ভাবেন, এই বুঝি অ্যামনেশিয়ার পূর্বলক্ষণ। কিন্তু সত্যিই কি তাই!? এত গুরুতর কিছু, নাকি ছোটখাটো অবহেলার কারণেই এই অবস্থা? ভুলে যাওয়ার রোগ মানেই বড় অসুখ নয়। বরং ছোটখাট কিছু জিনিস খেয়াল রাখলেই এর প্রতিকার মেলে। এ থেকে মুক্তি পেতে মেনে চলতে হবে কিছু উপায়:

• শব্দ নিয়ে খেলা শব্দ নিয়ে খেলতে থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভবনা কমে। ধরুন ই-মেইলের পাসওয়ার্ডের ক্ষেত্রে এমন একটা পাসওয়ার্ড দিলেন, যার এক একটা অক্ষর এক একটি শব্দের আদ্যাক্ষর। আর সবগুলো মিলিয়ে একটা বাক্য, যা হয়ত আপনার জীবনের খুব প্রিয় কোন ঘটনাকে বর্ণনা করছে। এরকম পাসওয়ার্ড থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খবুই কম। এটিএম পিনের ক্ষেত্রেও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যা ব্যবহার করা যেতে পারে।

• লিখে ফেলা কোন দরকারি জিনিস চট করে কোথাও লিখে রাখুন। পরে যদি হাতের কাছে লেখা কাগজটি নাও পান, তবু কী লিখেছেন মনে করতে গিয়ে অনেক সময় আসল জিনিসটা মনে পড়ে যায়। পড়ার পর ছাত্রদের ঠিক যে কারণে লিখতে বলা হয় এখানেও সেই একই যুক্তি কাজ করে। লেখার এই অভ্যাস ভুলে যাওয়ার হাত থেকে আপনাকে বাঁচাবে।

• স্মৃতিকে চ্যালেঞ্জ করুন আসলে চ্যালেঞ্জ জানান মস্তিষ্ককে। ক্রসওয়ার্ড পাজল খেললে এরকম মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়। এতে অনেক ভুলে যাওয়া জিনিসও মনে পড়ে যায়।

• বারবার এক জিনিস বলা, ধরা যাক নতুন কোন নাম বা ঠিকানা আপনাকে মনে রাখতে হবে। সেই শব্দটি বারবার করে বলতে থাকুন। এক কথা বারবার বললে তা মনে থাকতে বাধ্য।

• স্মৃতিভ্রংশের জন্য অনেকাংশেই দায়ী লাইফস্টাইল। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে কোলেস্টেরল, ব্লাড প্রেসার ও ব্লাড সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা হয় এবং স্মৃতিশক্তিও কমে যায়। চর্বি ও স্নেহপদার্থ জাতীয় খাবার যারা বেশি খান তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যেতে পারে। সুতরাং জীবনযাপনের ধরণ বদলালে এ থেকে মুক্তি মিলতে পারে।

• ধূমপানে নিকোটিন জমা হওয়ার ফলে রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রভাব পড়ে স্মৃতিশক্তিতে। অন্যদিকে যারা মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করেন তাদের ক্ষেত্রেও স্মৃতিভ্রংশ রোগ দেখা দেয়। ফলে এ দুটো বিষয় যত এড়ানো যায় ততই মঙ্গল। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও ভুলে যাওয়ার রোগ দেখা যায়।

চিকিৎসা

ডাক্তারের নির্দেশমতো কিছু কিছু ওষুধ রোগীর চিন্তাশীলতা ও শনাক্তকরণ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যামনেশিয়া রোগটি জটিল হয়ে গেলে রোগীর সেরে ওঠার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

যদি আপনার এধরনের সমস্যা থাকে তাহলে খুব দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *