ঘুম যখন রোগ এবং রোগের কারণ

সোহান ইদানিং সারাদিন শুধু ঘুমাচ্ছে। মায়ের বকুনিতে যদিও কিছু সময়ের জন্য উঠে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেই আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে ডিপার্টমেন্টের, এই ঘুমের ঘোরে থাকার জন্য ঠিক মতো ক্লাসও করতে পারছে না। আবার ঘুম থেকে উঠলেও তার খুবই ক্লান্ত লাগে, কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে থাকে মাথা। তার এসব লক্ষণ গুলো হলো “হাইপারসোমনিয়ার” লক্ষণ।

আসলে হাইপারসোমনিয়া কি?

হাইপারসোমনিয়া হল দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাধি, যেখানে একজন হয়তো দীর্ঘক্ষণ ধরে রাতের ঘুম অথবা দিনের বেলা অত্যাধিক ঘুমভাব উপলব্ধি করতে পারেন। যাঁরা অপর্যাপ্ত অথবা অশান্ত ঘুমের কারণে ক্লান্ত বোধ করেন তাঁদের তুলনায় যাঁরা হাইপারসোমনিয়ায় ভোগেন তাঁরা সারারাত ঠিক মতো ঘু্মানো সত্ত্বেও দিনের বেলা লম্বা ঘুম দিতে বাধ্য বোধ করেন।

হাইপারসোমনিয়া প্রায়শই অন্য রোগের সাথে জড়িত আর তা রোগীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।

অতিরিক্ত ঘুমানো কাকে বলে?

বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘুমানোর আদর্শ সময়সীমা ৬-৮ ঘন্টা। এখানে প্রাপ্তবয়স্ক বলতে বোঝানো হয়েছে যাদের বয়স ১৮-৬৪ বছর। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘুমের এই আদর্শ সময়সীমা প্রযোজ্য না। আমরা এখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুম নিয়েই কথা বলব। অর্থাৎ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ঘুম যদি দিনে ৮ ঘন্টার বেশি হয়ে যায়, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। তবে এর মানে এই না যে, আপনি সপ্তাহে কিংবা মাসে একদিন ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে ফেললে সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। আপনি যদি প্রায় প্রতিদিনই ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকেন, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুম বলতে পারেন।

কেন এই রোগটি হয়?

✓ স্লিপ ডিজঅর্ডার নারকোলেপসি বা সারাদিনে অতিমাত্রায় ঘুম হওয়া এবং স্লিপ এপনিয়া বা রাতে ঘুমানোর সময় শ্বাসক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটার কারণে এই রোগ হয়।

✓ স্লিপ ডিপ্রাইভেশণ বা রাতে যথেষ্ট ঘুম না হওয়া।

✓ অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি।

✓ মাদকাসক্ত হওয়া বা অতিরিক্ত অ্যালকোহলের ব্যবহার।

✓ মাথায় আঘাত বা স্নায়ুবিক দুর্বলতা থাকলে।

✓ প্রেসক্রিপশনভুক্ত কিছু ওষুধ যেমন: ট্রানকুইলাইজারস বা অ্যান্টিহিস্টামিনস নিয়মিত খেলে।

✓ জিনগত সমস্যা বা মা-বাবার হাইপারসোমনিয়া থাকলে।

✓ অনেক সময় বিষন্নতা থেকেও অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

হাইপারসোমনিয়ার ফলে সৃষ্ট কিছু রোগ

১. ডায়বেটিকস।
২. স্ট্রোক।
৩. ওজন বৃদ্ধি।
৪. মানসিক ভারসাম্যহীনতা।
৫. হৃদরোগ।
৬. ব্যাথার সৃষ্টি।
৭. অলস মস্তিষ্ক।

লক্ষণ

যাদের এই হাইপারসোমনিয়া আছে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়। যেমন –

* কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা
* শরীরে শক্তি কম থাকা
* স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা থাকা
* দুশ্চিন্তা করা
* দীর্ঘ দিন ধরে বিষণ্ণতায় থাকা

এগুলো নিদ্রাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের অতিরিক্ত ঘুমাতে বাধ্য করে। এছাড়াও ঘুমের মধ্যে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়, যা অনেক সময় অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদা তৈরি করে।

তবে সাময়িক অসুস্থতার জন্য কখনো কখনো কারো ঘুম অনেক বেশি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শরীর সুস্থ হবার পাশাপাশি এই অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদাও দূর হয়ে যায়। এছাড়া মাদকজাত দ্রব্য সেবন করলে কিংবা হীনম্মন্যতায় ভুগলেও অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস দেখা যায়।

অতিরিক্ত ঘুম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?

আমরা যারা নিজেদের এবং আশেপাশের লোকজনের এই অতিরিক্ত ঘুমানো নিয়ে বিরক্ত, তারা প্রায় সবাই এর থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে থাকি। এ ব্যাপারে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মতামত খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সাইকোলজিস্টদের বক্তব্য অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য এবং সাহায্য করতে পারে এমন কয়েকটি উপায় বর্ণনা করা হলো।

✓ আপনার কখন ঘুম থেকে ওঠা জরুরি তার উপর ভিত্তি করে ১-২টি অ্যালার্ম ঠিক করে রাখুন। প্রতিদিন একই সময় ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।

✓ অ্যালার্ম ঘড়িটি হাতের থেকে দূরে রাখুন। এতে অ্যালার্ম বন্ধ করার জন্য হলেও আপনাকে বিছানা ছেড়ে ওঠা লাগবে।

✓ যখন অ্যালার্ম বাজবে তখনই উঠে পড়বেন। ৫ মিনিট বেশি ঘুমানোর জন্য আপনার ১ ঘন্টার দেরি হয়ে যেতেই পারে!

✓ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা অনেকেই নাস্তা করতে চাই না। কিন্তু বলা হয়, যদি আপনি ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে সকালের নাস্তা সেরে ফেলেন, তাহলে আপনি সারাদিনের জন্য কিছু বাড়তি শক্তি পাবেন এবং এটি আপনাকে রাতে ভালো মতো ঘুমাতেও সাহায্য করবে।

✓ রাতে ১-২ ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন শুয়ে পড়বার চেষ্টা করবেন।

✓ সাধারণত সপ্তাহের বন্ধের দিন আমরা একটু বেশি ঘুমাই। এই অভ্যাসটি না করাই ভালো। এটি আপনার নিয়মিত ঘুমের ধারায় ব্যাঘাত আনতে পারে।

✓ নিয়মিত ব্যায়াম করুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এটি আপনার শরীর ও মন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।

✓ সকালের সূর্য দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

✓ কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা বা হীনম্মন্যতার মধ্যে থাকলে তার আসল কারণ খুঁজে বের করুন। এটি কীভাবে সমাধান করা যায় তা আগে ঠিক করুন। কারণ দুশ্চিন্তা আর হীনম্মন্যতা আপনাকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেবে না।

যাদের এই সমস্যা হচ্ছে উপরোক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করলে হাইপারসোমনিয়া থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *