মানসিক রোগ যখন তোতলানো

পিন্টু সাহেব সারাদিন অফিস করে এসেছে। আজ আবার অফিসে কাজের প্রেশারটা একটু বেশিই ছিল। রুমে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো এসময় তার স্ত্রী এসে তার সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করেছে। কিন্তু তিনি কোনো কথারই উত্তর দিতে পারছিলেন না, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের কাজের পর তিনি যেমন ক্লান্ত, তেমনি কিছুদিন যাবৎ তিনি মানসিক বিষণ্নতায় দিন কাটাচ্ছেন। শারীরিক ভাবে কিছুটা দুর্বলও লাগছে তার। এগুলো তার কথা জড়িয়ে যাওয়া বা “তোতলামির” সাথে জড়িত। তবে এই তোতলামি চিরস্থায়ী না হলেও মাঝে মাঝে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

অনেকের মধ্যে তোতলামির কারণে কথা আটকে যাওয়ার একটি ভয় কাজ করে। এই ভয়ের কারণে কথা আরও বেশি আটকে যায়,একে “সেলিসমোফোবিয়া” বলে। এটি সম্পূর্ণ একটি মানসিক রোগ। এই রোগের কারণে কেউ কেউ সবার সামনে কথা বলতে পারে না। ভয় পায়। মনে করে, হয়তো কথা মুখ দিয়ে বের হবে না। তখন নিজেকে সবার সামনে লজ্জায় না ফেলার জন্য গুটিয়ে নেয়।

✓ Stuttering is a speech disorder characterized by repetition of sounds, syllables or words; prolongation of sounds; and interruptions in speech known as blocks. An individual who stutters exactly known what he or she would like to say but has trouble producing a normal flow of speech. These speech disruptions may be accompanied by struggle behaviors, such as rapid eyes blinks or tremors of the lips. [Source : Wikipedia]

• তোতলামি বলতে মূলত মুখের জড়তাকে বোঝায়। তোতলামি বিষয়টাকে আমাদের সমাজে অনেকটা হাসি তামাশার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। যেমন:কেউ কথা বলতে তোতলালে বা ক্লাসে কেউ পড়া দিতে গিয়ে আটকে গেলে আমরা তা নিয়ে হাসতে থাকি। এটা কারও কাছে সাময়িক মজার বিষয় হলেও, যার তোতলামি সমস্যা আছে তার জন্য এটা খুবই পীড়াদায়ক।

কারণ

তোতলামি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। এর পেছনে শারীরিক, মানসিক, পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ কাজ করে। অনেক সময় পরিবার থেকেও এটি পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, শিশুদের কথা বলায় অনেক সময় দেরি হতে থাকে, তখন মা-বাবা শিশুর উপর কথা বলার জন্য প্রেশার দিতে থাকে। তখন এই তোতলামির সৃষ্টি হয়ে থাকে।

সাধারণত মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের তোতলামির সমস্যা বেশি হয়। তোতলামির সমস্যা থাকা প্রতি পাঁচজন ছেলের বিপরীতে মেয়ে থাকে মাত্র একজন। পুরো পৃথিবীতে তোতলামি সমস্যায় ভুগছে এমন লোকসংখ্যা মাত্র ১%। [Source : Internet]

সৃষ্ট সমস্যা

•  ভাষাগত জটিলতা:
সাধারণত ২-৫ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে তোতলামির লক্ষণ দেখা যায়। তবে এটা হয়ে থাকে নতুন কথা বলা শেখার কারণে। নতুন নতুন শব্দ শেখা, এর সাথে পরিচয় হওয়া, নতুন শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করা- এগুলোর কারণে বাচ্চাদের তোতলামি দেখা যায়। নিজের ভাষার সাথে পরিচিত হয়ে গেলে কিংবা অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই তোতলামি চলে যায়। এক্ষেত্রে তোতলামির সমস্যাটা স্থায়ী নয়।

•  শারীরিক ও মানসিক জটিলতা:
অনেকের মধ্যে তোতলামির কারণে কথা আটকে যাওয়ার একটি ভয় কাজ করে। এই ভয়ের কারণে কথা আরো বেশি জড়িয়ে যায়। কথা আটকে যাওয়ার যে ভয় কাজ করে, তার পেছনে একটি রোগ দায়ী। একে সেলিসমোফোবিয়া বলে। এই রোগটি সম্পূর্ণ মানসিক রোগ।

•  পরিবেশগত জটিলতা:
ব্যক্তি কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, তার উপর অনেকটাই তার মানসিক বিকাশ নির্ভর করে। তার বেড়ে উঠা আশেপাশের পরিবেশ যদি তার বিকাশে বাধা দেয়, তবে সে একজন ভীরু প্রকৃতির মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস থাকে না। যেকোনো কাজে নিজে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। পরিবারের লোকদের সাথে সুসম্পর্ক থাকে না, তাই নিজেকে একা ভাবতে থাকে। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির জন্য অন্যের সাথে কথা বলতে ভয় পায়,যা থেকে তোতলামির সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।

অনেক সময় দেখা যায়, অনেকে ভেবে থাকে শিশুর মুখে পয়সা দিলে তোতলামি কমে। এজন্য পরিবারের সদস্যরা শিশুর মুখে পয়সা দিয়ে রাখে। কিন্তু এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু মুখে পয়সা দিয়ে রাখলে মুখের ব্যায়াম হয়, পেশি শিথিল হয়। তবে এই পদ্ধতি তোতলামি কমাতে কোনো কাজ করে না। আরও এতে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

সমাধান

•  দ্রুত কথা বলার সমস্যা হলে ধীরে ধীরে বলার চেষ্টা করতে হবে।

•  কোনো কথা বলার আগে লম্বা শ্বাস নিয়ে নিন। দরকার হলে তিন সেকেন্ড করে বিরতি নিয়ে কথা বলুন।

•  কি কি কথা বলতে হবে, তা আগেই রেডি করে নিন, তাহলে আর ভয় কাজ করবে না। বা এক কথার মাঝে অন্য কথা হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না।

•  কোনো কথা বলা শুরু করলে, চেষ্টা করবেন কথার মাঝে কোনো বিরতি না দিতে। কারণ কথা বলার গতি পেয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আর কথা আটকাবে না।

•  কোনো শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হলে,তা বারবার বলার অভ্যাস করুন। আস্তে আস্তে তা ঠিক হয়ে যাবে।

এছাড়াও কিছু কিছু সাইকোলজিস্ট বলে থাকেন, যদি সবসময় হেসে হেসে কথা বলার অভ্যাস করা যায়, তবে আর কথা আটকানোর ভয় থাকে না। অন্যের সাথেও হাসিখুশি থাকুন। যেকোনো সমস্যা বা কথা বলতে সমস্যা হলে কথা বলার আগে কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করে নিন। এছাড়া মেডিটেশনও করতে পারেন।

লেখক : আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *