📮 বারবার মনে হয় আমি মারা যাচ্ছি

💌 মনচিঠি-০৭ (টেক্সট)

২০১০ সাল। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমার খুব কাছের বন্ধুর মা হঠাৎ করে মারা গেলেন। আন্টিকে আমি প্রায়শই স্কুলে দেখতাম, কথাও হতো। তার এরকম হঠাৎ মৃত্যুর ব্যাপারটা আমাকে বেশ নাড়া দিলো। আমি তখন ই প্রথমবারের মতো মৃত্যু নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতে শুরু করলাম। আর একটা জিনিস খুব শক্ত করে মাথায় গেঁথে গেলো- ‘আমাকেও একদিন মরে যেতে হবে!’

মাসখানেকের ব্যবধানে আমার মনের অবস্থার আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়ে গেল। আমার সারাদিন ই মনে হতে থাকতো আমি মারা যাব। প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার এভাবে কাটতো। আমার আচরণে অনেক পরিবর্তনও আসে। আমি যেহেতু মুসলিম পরিবারের সন্তান, তাই আমি ধর্মীয় বিষয়টাকে কেন্দ্র করে ভাবতাম। আমি ভাবতাম- ‘পৃথিবীতে এই ১০ বছরে তো আমি অনেক পাপ করে ফেলেছি। এই পাপের শাস্তি তো অনেক! আর তাছাড়া আমাকে তো মরতে হবেই।’

একপর্যায়ে এমন মনে হতো যে- ‘আমি এখনই মারা যাবো! আমি কালই মারা যাবো!’ এই ভেবে প্রায় সব ছেড়ে দিয়েছিলাম প্রায়। মৃত্যুচিন্তা আমাকে সারাক্ষণ কষ্ট দিতো।

সেবার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্কুল শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমি সেরে উঠি। তারপর আর ওই চিন্তাটা প্রকটরূপ নেয় নি।

তবে ২০২০ সালে এসে করোনার প্রভাবে দীর্ঘ ৩ মাসের বেশি লকডাউনে থেকে এবং আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে করতে আমাকে অন্য সমস্যায় ধরে বসেছে।

তার আগে আমি আমার দুশ্চিন্তার কারণগুলো বলি-
• আমার জেলায় প্রথম থেকেই আক্রান্তের সংখ্যা বেশি
• প্রতিনিয়ত দেশের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে আমি এবং আমার পরিবার কিভাবে বাঁচবো- এই নিয়ে একটা চিন্তা
• আমার বাবা মালয়েশিয়া প্রবাসী। তাকে বাইরে কাজ করতে বের হতে হয়। তাকে নিয়েও আমি বেশ চিন্তগ্রস্থ থাকি।

এই সব কিছুর প্রভাবে (শারীরিক কিছু কারণও আছে বটে যেমনঃ রাতজাগা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা) রমজান মাসে একদিন সেহেরির পর আমার শরীর খারাপ করে। তখনকার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা-
• বুক ধরফর করা (খুব বেশি না)
• শরীর অবশ হয়ে আসা
• গলা শুকিয়ে যাওয়া
• আর সবচেয়ে বেশি যেটা অনুভূত হওয়া- আমি এখনই মারা যাচ্ছি!

সেদিন সুস্থ হলেও প্রায় প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ই আমাকে অজানা আতঙ্কে ধরে বসতে শুরু করে। বুকটা ধপাস করে উঠে আর মনে হয় – এখনই মারা যাবো! খুব ভয় করে তখন।

আমি ইন্টারনেটে খোঁজ করে জানতে পারি – এটা প্যানিক এটাকের মতো কিছু। তাই মেডিটেশন আর ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা দিয়ে পরিস্থিতিটাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সমস্যাটা কমতে থাকে। তবে ১/২ দিন পর পর সমস্যাটা কিছুটা হয়।

গতকয়েকদিন আগে থেকে আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাই। এবং সাথে সাথে আবার সেই পুরোনো ‘ডেথ ফিয়ার’ সমস্যাটাও প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, আমার ছোটখাটো শারীরিক সমস্যা ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। যখন সমস্যাটা হয়, তখনকার মানসিক অবস্থা-
• হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত না হলেও, কেমন যেন অস্বস্থি কাজ করে। দম বন্ধ হয়ে আসবে এমন মনে হয়।
• বার বার মনে হয় আমি মারা যাচ্ছি/যাবো
• কোন প্রকার কাজে মন দিতে পারি না।

সবকিছু সংক্ষিপ্ত আকারে দাড়ায়-
১. প্যানিক অ্যাটাক
২. মৃত্যু ভয়
৩. দুশ্চিন্তা

আমি এ সমস্ত চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তি পেতে চাই!

📮 মনচিঠি টেক্সট-০৭ এর উত্তর

প্রথমেই অনেক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই আপনাকে DUOS মনচিঠির পাতায় সাহায্য চাইবার জন্য।

এটা খুব ইতিবাচক একটা দিক যে আপনি আপনার বর্তমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ভেবেছেন, নিজে কিছুটা চেষ্টা করেছেন এবং পরবর্তিতে আরো সাহায্যের জন্য মনচিঠির পাতায় জানিয়েছেন।

আপনার লেখা থেকে যতটুকু আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনার শৈশবের একটি অবদমিত অনুভূতি (মৃত্যুভয়), যা ঐসময় আপনি অন্যদের সাহায্যে কাটিয়ে উঠতে পারলেও তা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। সেই ভীতি আজ বিভিন্ন ট্রিগারের কারণে আবার আপনার মাঝে ফিরে আসছে। এই অবস্থায় আপনাকে সবচেয়ে ভালো সাহায্য দিতে পারেন একজন মনোবিজ্ঞানী যিনি Nuro Linguistic Programming বা EMDR থেরাপি চর্চা করেন। আপনি তেমন একজনের সাহায্য নিতে পারেন।

এছাড়া সাময়িক সমাধান পেতে আপনি Breathing Exercise করতে পারেন। প্রথমে লম্বা করে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হবে, কিছুটা সময় তা ধরে রাখতে হবে (৪/৫ সেকেন্ড), তারপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে প্রশ্বাস ছাড়তে হবে। এই ব্যায়াম আপনার বুক ধড়ফড় ও অস্বস্তি ভাব কমাতে সাহায্য করবে।

মৃত্যুভীতি আমাদের এক ধরনের দুঃশ্চিতার ফলাফল। আপনি আপনার এই দুঃশ্চিতার কারনগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। সেই কারনগুলো আপনার মধ্যে কি কি চিন্তার উদ্রেক ঘটাচ্ছে তা ভেবে দেখুন।

যদি ধরে নেই আপনার পরিচিত কারো মৃত্যুর খবর আপনি জানতে পারলেন এখন এর ফলে আপনার মধ্যে সেই ভীতি আবার কাজ করতে শুরু করলো আপনি ঐ মুহুর্তে ভাবতে শুরু করলেন আপনিও মারা যাবেন বা মারা যাচ্ছেন। আপনার এই ভাবনা আপনার মস্তিষ্ককে ভয়ের ম্যাসেজ পাঠাবে আর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার বুক ধড়ফড় আর অস্বস্তির বোধ হবে।

এই সময় আপনি Imagery Relaxation প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে কিছুটা আরাম দিতে পারেন। আপনি আপনার জীবনের খুব আনন্দদায়ক কোন মূহুর্তের কথা তখন ভাবতে পারেন বা কোন হলিডে বা প্রিয় কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি মনে করতে পারেন যা আপনার মধ্যে অনেক ভালো লাগার অনুভূতি তৈরী করেছিল। এই ভালোলাগার অনুভূতিই আপনাকে আবার আরাম দিবে আর ধীরে ধীরে আপনার প্যানিক অবস্থার বোধকে কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

কিছুটা স্ট্যাবল অবস্থায় আসার পর আপনি ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবতে পারেন। যেমন আপনার যখন মৃত্যুভীতি প্রবল হচ্ছিল তখনই আপনার কি কি রিসোর্স আছে তা থেকে বের হয়ে আসার বা আপনার নিজেকে সুরক্ষিত রাখার কি কি উপায় আপনার আয়ত্তে আছে আর কিভাবে আপনি তা ব্যবহার করছেন এরকম কিছু ইতিবাচক ভাবনার চর্চা করতে পারেন।

পরিশেষে আবারো বলবো প্রফেশনাল কারো সাহায্য নিন এবং আশা করছি দ্রুত এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেন।

খালেদা ইয়াসমিন
সাইকোলজিক্যাল এক্সপার্ট, মায়ালোজি, ব্র্যাক
২৬, পিয়ার কাউন্সেলর, মনচিঠি, ডিইউওএস
bithikhaleda04@gmail.com

💌 অনলাইন চিঠি ও উত্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ‘মনচিঠি’তে লিখতে হবে।

📞 ভয়েস কলে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

☎️ হটলাইন নম্বরে ফোন করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল, ফেসবুক পেজ, সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নেয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *