সংগঠনে কেন যুক্ত হব?

প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। অনেকে নিশ্চয়ই যুক্ত আছেন এমন বিভিন্ন দলের সঙ্গে। আবার অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, ক্লাব বা সংগঠনে কাজ করা মানে সময় নষ্ট, পড়ালেখার ক্ষতি। সত্যিই কি তাই?

অন্যদের চেয়ে আলাদা

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কেন সংগঠনে যুক্ত হবেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল সোসাইটির মডারেটর সাবরিনা সুলতানা চৌধুরীর মতে, ‘সুস্থ সংগঠনগুলোতে চর্চার মাধ্যমে ইতিবাচক গুণাবলি তৈরি হয়। দায়িত্বশীলতা বাড়ে। নেতৃত্বগুণ তৈরি হয়। ধরুন, একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী হয়তো নাচ-গান-আবৃত্তি কিছুই জানে না, দেখবেন তবু সে একজন “সংগঠন না করা” মানুষের চেয়ে আলাদা।’

বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেন রাজধানীর আপডেট ডেন্টাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওসামা বিন নূর। কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাত থেকে ‘কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়া এই তরুণ বলেন, ‘নেতৃত্বের পুরো ব্যাপারটা আমি সংগঠন থেকে পেয়েছি।’ ওসামা মাদ্রাসায় পড়েছেন। তবে নেতৃত্বের জায়গায় নিজেকে তৈরি করেছেন জাগো, বিওয়াইএলসিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে। তাঁর মতে, ‘মতামত জানানো, প্রোগ্রামের বাজেট তৈরি, স্পনসর জোগাড় করা—এসব করতে করতে অবচেতনে একটা প্রশিক্ষণ হয়ে যায়, যেটা পেশাজীবনে কাজে আসে।’

‘সংগঠনে জড়িত থাকার ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস-দূত হিসেবেও কাজ করার সুযোগ মেলে।’ এমন যুক্তি তুলে ধরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) বিতর্ক ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক তানসিফ আনজার বলেন, ‘পড়াশোনা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম একে অপরের সহায়ক।’

প্রতিটি ক্লাব বা সংগঠনের মৌলিক বিষয় একই। যেমন সবার মতকে শ্রদ্ধা করা, সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। এমনটাই বিশ্বাস করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও রোবটিকস ক্লাবের উপদেষ্টা মো. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যারা কম্পিউটার বা রোবট ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত, তারা নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দ উপভোগের সুযোগ পায়।’

উচ্চশিক্ষায় বাড়তি সুবিধা

উচ্চশিক্ষায় সংগঠন বা সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পান। এর বড় প্রমাণ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র তারিক আদনান মুন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাঁর সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘আমার ভর্তির ক্ষেত্রে গণিত অলিম্পিয়াডের সাফল্য খুব সাহায্য করেছে। এ ছাড়া বিতর্ক সংগঠনসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেগুলোকেও ভর্তির সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।’

তাঁর কাছে জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব গুরুত্বের সঙ্গে শ্রেণি–বহির্ভূত কার্যক্রমের বিষয়টি আমলে নেয়, বিশেষ করে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির সময়। কারণ স্নাতক পর্যায়ে যাঁরা ভর্তির জন্য আবেদন করেন, তাঁদের ফলাফলসহ আইইএলটিএস বা টোয়েফল কোর্সের স্কোর প্রায় সমান থাকে। তখন নেতৃত্বগুণ আছে কি না, পাঠ্যবইয়ের বাইরে সামাজিক অন্য কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, এসব গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নির্ভয়ে সবার সামনে

সাব্বির আহমেদের কথাই ধরা যাক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র একটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নি হিসেবে যোগ দিতে আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তাঁর জীবনবৃত্তান্ত দেখে জানাল, ‘ইন্টার্নি নয়। আমরা তোমাকে চাকরি দিতে চাই!’

কেন? শোনা যাক সাব্বিরের কাছেই, ‘আমি বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্বের জায়গায় ছিলাম। যোগাযোগ, মানুষকে বোঝানোর দক্ষতা—এসব তো আগে থেকেই শেখা আছে। তাই চাকরি পেতে সমস্যা হয়নি।’ শুধু সাব্বির নন, এমন উদাহরণ আছে আরও। যেমন বিতর্ক সংগঠনসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী ফারহানা জাহানের। সংগঠনে জড়িত থাকার ফলও পেয়েছেন তিনি বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার সময়। বলছিলেন, ‘ভাইভা বোর্ডে নার্ভাসনেস দূর করতে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, সংগঠন করলে সব সময় মানুষের সঙ্গেই কাজ করতে হয়, কথা বলতে হয়, বোঝাতে হয়।’

মানতে হবে সময়ের ভারসাম্য

প্রতিটি সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম থাকে। সংগঠনের কাজে সময় দিতে গিয়ে কি পড়াশোনার ক্ষতি হয়? নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হাই, ‘আমার হয় না। কারণ আমি ভারসাম্য রক্ষা করে চলি। নিজের মতো করে সময় ভাগ করে নিই।’

কেমন সংগঠনে যুক্ত হব?

কে কী ধরনের সংগঠনে যুক্ত হবে, বিষয়টি নিজের পছন্দের ওপর নির্ভর করে। কেউ বিতর্ক করবে, কেউ আলোকচিত্রী হবে, কেউ আবার মূকাভিনয় কিংবা রোবটিকস ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হবে। আবৃত্তির সংগঠন, নাটকের দল…নানা দিকেই মানুষের আকর্ষণ থাকতে পারে। বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী। তিনি যোগ করেন, ‘যে সংগঠন আমাদের পরিবার, ধর্ম, সমাজ—সর্বোপরি দেশের জন্য সাংঘর্ষিক নয়, নিশ্চয়ই এমন সংগঠনেই জড়াতে হবে।’

সংগঠনগুলোকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে

আসাদুজ্জামান নূর, সংস্কৃতিমন্ত্রী

বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আমরা সব সময় উৎসাহিত করি। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংগঠনগুলোকে আমরা একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। সবাই যেন গুছিয়ে কাজ করতে পারে।
এখন সংগঠনগুলোকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অনুদান দিয়েছি, যেন তারা তাদের কার্যক্রম আরও এগিয়ে নিতে পারে। যেহেতু অনুদান দেওয়া হচ্ছে, আমরা চাই সংগঠনগুলোর মধ্যে জবাবদিহির জায়গা তৈরি হোক। আশা করছি, সামনের দিনে তারা আরও ভালো ভালো কাজ করবে।

সংগঠনের ছায়ায় ব্যক্তি নিজেকে বিকশিত করতে পারে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক

সংগঠন মানুষকে সহনশীলতা শেখায়, একসঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশক অবধি আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল একরকম—পড়ার সংস্কৃতি ছিল, খেলাধুলার সংস্কৃতি ছিল। পাড়ায় পাড়ায় ছিল গ্রন্থাগার। তখনকার সংগঠন বা সংঘগুলো আবর্তিত হতো এ বিষয়গুলো ঘিরে। সুনির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধের ভিত্তিতে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরে স্বাধীনতা-উত্তরকালে নব্য ধনবাদের উত্থান আমাদের মূল্যবোধগুলোকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি দিল। সেই সঙ্গে বিনষ্ট রাজনীতি, নগরায়ণ—এই প্রপঞ্চসমূহ সংগঠনের ভিত্তিকে দিনে দিনে ভোঁতা করে তুলল। আজ মানুষের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা—এগুলো দূর হতে পারে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে, শুভময় সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত করার মাধ্যমে। ভালো কোনো সংগঠন—সে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়াকেন্দ্রিক—যা-ই হোক না কেন, তার নির্দিষ্ট মূল্যবোধ বা আদর্শ থাকে। সেই সংগঠনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তি যেমন নিজেকে বিকশিত করতে পারে, তেমনি সামাজিক সুস্থতাও আসতে পারে এই উপায়ে।

লেখক : সজীব মিয়া
সূত্র : প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *