বন্ধুদের মাঝে জনপ্রিয় হবেন কীভাবে?

কীভাবে মানুষের মন জয় করা যায়, কিংবা বন্ধুদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠা যায়, এ প্রসঙ্গে সেরা লেখাটা সম্ভবত ডেল কার্নেগিই লিখেছেন। তাঁর লেখা হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল বইটি সেই ১৯৩৬ সালে লেখা, অথচ এখনো আশ্চর্য সমসাময়িক। ডেল কার্নেগির বইটার তুমুল জনপ্রিয়তার সম্ভবত আরও একটা কারণ আছে। ১৯৩৬ সালের পর পৃথিবীতে বহু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাটা বোধ হয় এখনো একই রকম আছে।

বন্ধুদের প্রায় সব দলেই একজন থাকেন বিশেষ। যাঁর কথার সঙ্গে সবাই প্রায় একমত হন। যে বন্ধুর জন্য সবাই উদ্‌গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করেন। বলা হয় না কখনো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই তাঁর মতো হতে চান। যে বন্ধুর সাফল্যে ঈর্ষা হয়, আবার তাঁর খারাপ ফল অন্যদেরও মন ভারী করে। নেতা হতে অনেক সময় কৌশলী হতে হয়, তবে বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে নিজের সহজাত বিষয়টাকেই শুধু সামনে রাখা দরকার, যা একধরনের বিশেষ গুণ। কিছু বিষয় নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন সেই জনপ্রিয় বন্ধু।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা মোসতাফা খানম বলেন, ‘বন্ধুদের যেকোনো দলের মধ্যে একজন বিশেষভাবে জনপ্রিয় থাকে। এটা অনেক সময় বন্ধুদের ছোট দল থেকে পুরো ক্লাসেও তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সেই মানুষটির ভেতর কিছু স্বাভাবিক গুণাবলি থাকতে হয়। এটা হয়তো সে সচেতনভাবে তৈরি না–ও করতে পারে। হয়তো এটাই তার স্বভাব, যা মানুষকে তার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।’

অনেকেই বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে রোজ রোজ দামি খাবার খাওয়াতে পারেন। কিনে দিতে পারেন দামি কোনো উপহার। কিন্তু তাতে কি জনপ্রিয়তা বাড়ে? সুলতানা মোসতাফা খানম মনে করেন, ‘মোটেও না; বরং অর্থের লোভে তার আশপাশে যারা ঘুরবে, তারা কখনো প্রকৃত বন্ধু হবে না।’

ভালো নেতা হওয়ার জন্য যেমন বিশেষ কিছু গুণ থাকতে হয়, বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতেও তেমন কিছু গুণের দরকার পড়ে।

শুরুতেই বাজিমাত

আপনি যখন নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবেন, সেখানে নানা রকম ছেলেমেয়ে থাকবেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আপনার কাছের বন্ধু হয়ে উঠবেন। বন্ধুরা যেন আপনাকে তাঁদের দলে পেতে চান, সেভাবেই নিজেকে তৈরি করুন। প্রথম দিনের পরিচিত পর্বেই ‘নজরে পড়া’র কাজটি সেরে নিতে পারেন। পরিপাটি পোশাক, ঠিকঠাক চুলের স্টাইল, সুন্দর কথা বলার পাশাপাশি থাকুন স্বাভাবিক। তরুণদের ভাষায় ‘বেশি ভাব নেওয়া’ ছেলেমেয়েকে বাকিরা কম পছন্দ করেন।

নাম মনে রাখুন

কারও সঙ্গে প্রথমবার পরিচয় হলে তাঁর নাম মনে রাখুন। পরেরবার দেখায় তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করলে তিনি সহজেই আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবেন। আপনি যে তাঁকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটা মনে করেই মানুষটি আপনাকে তাঁর প্রিয়জনের তালিকায় নিয়ে আসবেন।

কথা বলুন স্পষ্ট ভাষায়

আপনি যখন বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলবেন, তখন স্পষ্ট ভাষায় কথা বলুন। কথা বলুন তাঁদের ভাষায়, তাঁদের মতো করে। আপনাকে যেন কখনো ভিন্ন কেউ মনে না হয়; বরং আপনার স্পষ্ট কথা তাঁদের কাছে আপনাকে বিশেষ জায়গা করে দেবে। বন্ধুদের কাছে কথা চেপে না রেখে প্রকাশ করুন। এতে তাঁরাও আপনার ওপর আস্থা রাখবে।

গোপনীয়তা রক্ষা করুন

যেকোনো সম্পর্কে অন্যের আস্থাভাজন হওয়া খুব জরুরি। কেউ আপনাকে যখন বিশ্বাস করে কোনো কথা বলবেন, সেটার গোপনীয়তা বজায় রাখা আপনার দায়িত্ব। এক বন্ধু যখন আপনাকে গোপনে কিছু বলবেন, সেটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে তিনি আপনার ওপর আস্থা হারাবেন। আপনাকে বিশ্বাস করবেন না। বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে এই গুণ আপনাকে ওপরের দিকে তুলে দেবে।

চুলচেরা বিশ্লেষণ নয়

বন্ধুত্বের সম্পর্কে কখনো কোনো বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে না যাওয়াই ভালো। বন্ধুদের সবাই এক মানসিকতার হবেন না, কেউ কেউ থাকবেন ভিন্ন। যিনি যেমন, তাঁকে সেভাবে গ্রহণ করতে পারলে সবার কাছেই আপনার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।

সবার সঙ্গে চলুন

বন্ধুদের মধ্যে কে বড়লোক আর কে গরিব, এই চিন্তা বাদ দিন। বন্ধুকে ব্যক্তি হিসেবে চিনুন। আপনি যখন সবার সঙ্গে মিশবেন, আপনার প্রতি সবার একধরনের আস্থা তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্লাসে পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের আলাদা চোখে না দেখে তাঁদের সঙ্গে সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করুন। নিজ থেকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁদের খোঁজ রাখুন। এতে তাঁরাও আপনার প্রতি ভালোবাসা দেখাবেন।

প্রশংসা করুন

কেউ কোনো কাজে ভালো করলে মন খুলে তাঁর প্রশংসা করুন। কোনো বন্ধুকে তিরস্কার করবেন না। যাঁর যে ভালো গুণ আছে, সেগুলো সামনে এনে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন। নতুন কারও সঙ্গে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁর ভালো গুণের কথাগুলো বলুন।

নিজেকে চাঙা রাখুন

যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে চাঙা রাখুন। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকুন সারাক্ষণ। এতে বন্ধুদের মধ্যে হতাশা কেটে আপনাকে দেখে চঞ্চলতা বাড়বে। সব বন্ধুর সঙ্গে দুষ্টুমি করুন, তবে সীমা অতিক্রম করবেন না। কারও দুর্বলতাকে কটাক্ষ করে অন্যদের সামনে তাঁকে খাটো করা যাবে না। কোনো বন্ধুকে টিজ করা বা বুলিং করা যাবে না; বরং কেউ বুলিং করলে তার প্রতিবাদ করুন। এতে বুলিংয়ের শিকার বন্ধুটি আপনাকে বিশেষভাবে ভালোবাসবেন।

নেতা নেতা ভাব নয়

বন্ধুদের মধ্যে জোর করে নেতা হওয়ার কিছু নেই। হুমকি-ধমকি বা চড়া গলায় কথা বললে আপনাকে কেউ মন থেকে ভালোবাসবে না। আপনি যদি আলাদা করে বাইরে পরিচিতি পেয়েও থাকেন, বন্ধুদের মধ্যে সেটার প্রভাব দেখাবেন না। বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি যেমন ক্রিকেটারই হই না কেন, বন্ধুদের কাছে আমার কোনো বিশেষ পাত্তা নেই। তাদের কাছে আমি সেই মাগুরার সাকিবই। এই বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগে।’

খোঁজ রাখুন

কোনো বন্ধুর সঙ্গে কয়েক দিন দেখা না হলে তাঁর খোজ নিন। করোনাভাইরাসের কারণে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাই গুটিকয় বন্ধুর সঙ্গে হয়তো ফোনে বা ফেসবুকে যোগাযোগ হচ্ছে। কিন্তু আপনি বাকি বন্ধুদেরও খোঁজ নিন। আপনার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফোনকল বা ফেসবুকের নক তাঁকে বিস্মিত করবে। তিনি আপনাকে আপনজন ভাববেন।

সূত্র: প্রথম আলো, কনসালটিং ডট কম ও উইকি হাউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *