সফল মানুষ মাত্রই সুখী মানুষ নন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, সারা বিশ্বেই তিনি এখন তুমুল আলোচিত। ২০১৭ সালের ২১ মে যুক্তরাষ্ট্রের কলবি কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তরুণদের সামনে এক অনবদ্য বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। যে বক্তৃতায় তাঁর নীতি, অনুপ্রেরণা, মনোভাব সম্পর্কে জানা যায়।

“সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়া আমার কাছে খুব কঠিন কাজ মনে হয়। সত্যিই। কারণ, বক্তৃতা চলাকালীন শিক্ষকেরা মনে মনে বলেন, ‘এখন জীবনের ১৫তম সমাবর্তন বক্তৃতাটা শুনতে হবে।’ শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি শেষ করুন, আমাদের পার্টি শুরু হবে।’ আর অভিভাবকেরা বলেন, ‘অর্থবহ কিছু বলুন, যেন টিউশন ফি দেওয়াটা সার্থক মনে হয়।’ তবে তাই হোক। চেষ্টা করব, তবে জানি না পারব কি না।

১৯৬৮ সালে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে সমাবর্তন বক্তৃতা দিতে হাজির হয়েছিলেন বব হোপ। তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। উপস্থিত অন্যান্য তারকা, শিক্ষকদের পর বব হোপ বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের আমার শুধু একটা কথাই বলার আছে: যেয়ো না’। এ কথা বলে তিনি বসে পড়লেন। এটাই সম্ভবত সে বছরের সবচেয়ে অর্থবহ সমাবর্তন বক্তৃতা ছিল।

বাবার কাছে শেখা

আমার বাবা ছিলেন একজন সহৃদয় ব্যক্তি। হাইস্কুল পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু শিক্ষিত এবং সত্যিকার সজ্জন ছিলেন। বলতেন, ‘জো, প্রত্যেক নারী, পুরুষ, শিশুকে শ্রদ্ধা করা উচিত। সম্মান সবার প্রাপ্য।’ চলার পথে কেউ ভিক্ষা চাইছেন, আর আমার বাবা তাঁকে কিছু না দিয়েই চলে গেছেন, এমন কখনো হয়নি। আমি বলতাম, ‘বাবা, সে তো এই টাকা ফুর্তি করবে, মদ খাবে।’ বাবা বলতেন, ‘তোমার কি মনে হয়, ভিক্ষা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ থাকলে তিনি এই কাজ করতেন? মানুষটা যে-ই হোন না কেন, মর্যাদা তাঁর প্রাপ্য।’

বন্ধুরা, তোমাদের সবার অনেক দায়িত্ব—তোমরা জানো, মানুষকে সম্মান দেওয়ার শিক্ষা তোমরা এখানে পেয়েছ, এখানে আসার আগেও পেয়েছ। সমানুভূতিপূর্ণ একটা শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। যেন যে বন্ধুরা আমাদের মতো নন, তাঁরা জানেন, আমরা তাঁদের বুঝি।

অনলাইনে আমরা নিজেরা নিজেদের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, এই আত্মকেন্দ্রিকতা কোনো জীবন নয়। মুঠোফোন বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকা আমাদের একটা অগভীর, আন্তরিকতাহীন সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে মানুষের ধ্যানধারণায় অনেক সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। একজন মানুষ একটা খারাপ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু আমরা তাঁকে খারাপ মানুষ ভেবে দূরে ঠেলে দিই। টেবিলের উল্টো দিকে থাকা মানুষটি হয়তো এমন এক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছেন, যাঁদের কাছে আমি কখনো যাইনি। রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চে যিনি আমার উল্টো দিকে আছেন, তিনি দেখতে আমার মতো নন, তাঁর বেড়ে ওঠা হয়তো একেবারেই ভিন্ন। মানবিকতার আদর্শ উদাহরণ তাঁরা নন, বৈশিষ্ট্যে-গুণে নানা জায়গায় ঘাটতি আছে। তাঁরাও রক্ত-মাংসের মানুষ, ত্রুটিযুক্ত, পৃথিবীতে সফল হওয়ার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন—ঠিক তোমার মতোই। তোমার ভেতর যত জটিল অনুভূতি খেলা করে, তোমার উল্টো দিকের মানুষটির ক্ষেত্রেও তা-ই, সেভাবেই তাঁকে গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের শক্তি

ক্যাম্পাসে গল্প করার সময় তোমরা যখন একে অন্যের গল্প শোনো, তা থেকে তোমার নিজের একটা গল্প তৈরি হয়। কলবিতে তুমি যত কিছু শিখেছ, এটাই হয়তো তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জীবনে চলার পথে আমি দেখেছি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলাই আসলে সব। রাজনৈতিক সম্পর্ক বলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বলো—সবই আসলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক।

গত ৪২ বছরে বিশ্বের সব বড় বড় নেতার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। এমন অনেক মানুষের সঙ্গে মিশেছি, যাঁদের ক্ষমতাবান বলে মনে করা হয়, এমনকি তাঁরা সত্যিই ক্ষমতাবান। আমি দেখেছি, সফল মানুষ মাত্রই সুখী মানুষ নন। যাঁরা সাফল্য আর সুখের মাঝখানের মধুরতম জায়গাটা আবিষ্কার করতে পারেন, আমি দেখেছি তাঁদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার গুণ আছে। সহকর্মীর মা-বাবা যখন অসুস্থ থাকেন, কিংবা তাঁর সন্তান যখন কলেজ স্নাতক হন কিংবা কোনো দুর্ঘটনার শিকার হন, তাঁর খোঁজ রেখো। এটিই সত্যিকার সম্পর্ক গড়ে তোলে, পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে, কঠিন এই পৃথিবীতে আমাদের চলার পথ সহজ করে।

এই শিক্ষা আমি পেয়েছি, যখন ৩০ বছর বয়সী একজন তরুণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের অংশ হই। আমি সিনেটে যেতে চাইনি। ৩ নভেম্বর আমি নির্বাচিত হই। ১৮ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে আমার কর্মীদের নিয়োগ দিতে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় একজন নারী আমাকে ফোন করলেন। তিনি আমাকে চেনেন না, সে জন্যই তাঁকে দিয়ে ফোনটা করানো হয়েছিল। একঘেয়ে স্বরে তিনি বললেন, ‘মিস্টার বাইডেন, আপনার স্ত্রী মারা গেছেন। আপনার মেয়ে মারা গেছেন। আপনার ছেলে বাঁচবেন কি না জানি না। আপনার এখন বাড়ি ফেরা উচিত।’ আমার পরিবার ক্রিসমাসের কেনাকাটা করতে গিয়েছিল। এমন সময় একটা ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হলো, আর হঠাৎ করেই সব বদলে গেল।

এ ঘটনা আমার জীবনে একটা বড় শিক্ষা। মাইক ম্যানসফিল্ড, এড মাসকির এবং আরও কয়েকজন প্রবীণ সিনেটর বলেছিলেন, ‘আসুন, শপথ গ্রহণ করুন। ছয় মাসের জন্য থাকুন। মাত্র ১ হাজার ৭০৩ জন মানুষের শপথ গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছে। আপনাকে এই অবস্থানে আনার জন্য আপনার স্ত্রী কঠোর পরিশ্রম করেছেন। পরিবারের ঋণ শোধ করতেই আপনার শপথ গ্রহণ করা উচিত।’ কিন্তু আমি যেতে চাইনি। তাই যেদিন আমার শপথ গ্রহণ করার কথা, সেদিন আমি সিনেটে যেতে রাজি হলাম না। আমিই সম্ভবত ইতিহাসের একমাত্র সিনেটর, যিনি হাসপাতালে শপথ গ্রহণ করেছি। কারণ, আমি আমার ছেলেকে ছেড়ে যেতে চাইনি। তাই সেক্রেটারি হাসপাতালে এসেছিলেন আমাকে শপথ গ্রহণ করানোর জন্য।

তোমাদের প্রজন্মের ওপর সফল হওয়ার ভীষণ চাপ। তোমাদের অর্জন অনেক। কিন্তু একই সঙ্গে হয়তো লক্ষ্য করেছ, তোমরা একটা গণ্ডির মধ্যে পড়ে গেছ। যে গণ্ডিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেয়ে সমাজের তৈরি করা ‘সফল হওয়ার ফাঁদে’ পড়াই গ্রহণযোগ্য। ‘চাকরি করো, মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তৈরি করো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঘুরে বেড়াও, কোনো ঝুঁকি নিয়ো না, কোনো পরিবর্তন করতে যেয়ো না’—ব্যস। অথচ মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল নিজের সুযোগ, নিজের সাফল্য খোঁজা নয়।

গণ্ডিতে বন্দী থেকো না

তোমাদের প্রজন্মের ওপর সফল হওয়ার ভীষণ চাপ। তোমাদের অর্জন অনেক। কিন্তু একই সঙ্গে হয়তো লক্ষ্য করেছ, তোমরা একটা গণ্ডির মধ্যে পড়ে গেছ। যে গণ্ডিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেয়ে সমাজের তৈরি করা ‘সফল হওয়ার ফাঁদে’ পড়াই গ্রহণযোগ্য। ‘চাকরি করো, মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তৈরি করো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঘুরে বেড়াও, কোনো ঝুঁকি নিয়ো না, কোনো পরিবর্তন করতে যেয়ো না’—ব্যস। অথচ মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল নিজের সুযোগ, নিজের সাফল্য খোঁজা নয়। কারণ, যা-ই করো না কেন, নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করার মতো গণ্ডি তুমি গড়ে তুলতে পারবে না।

পরিবর্তনশীল পৃথিবীর চাপ থেকে এই ডিগ্রি তোমাদের রক্ষা করবে না। তোমার জনগোষ্ঠীতে যা হবে, তা তোমার ওপরও প্রভাব ফেলবে। তোমার বোন যদি পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়, তুমিও ভুগবে। তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুটি যদি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দুশ্চিন্তায় থাকে, তার মানে তুমিও ভালো নেই। যদি বিশুদ্ধ বাতাসে বুকভরে শ্বাস নিতে না পারো, যত সাফল্য বা টাকাই তোমার থাকুক না কেন, কোথাও লুকিয়ে বাঁচতে পারবে না।” (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুদিত
সূত্র: টাইম ডটকম, প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *