ওই মেয়েটার সাথে আর কখনোই রিলেশনে যেতে চাইনা

📮 মনচিঠি টেক্সট-৩৬ (প্রেরকের সম্মতিতে প্রকাশিত)

১. গার্লফ্রেন্ড ছিলো। প্রায় ১০ মাসের মতো আমাদের সম্পর্ক ছিলো। আমি তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম। কিন্তু একদিন যেকোনোভাবে ওর পাসওয়ার্ড নেই এবং দেখি আমি ছাড়াও তার আরও ২/৩ জন বয়ফ্রেন্ড আছে। এবং তাদের মধ্যে অনেক এডাল্ট কথাবার্তা ছিলো। যেটার জন্য ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আমাদের ব্রেকাপ হয়। ব্রেকাপের পর ও আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসতে চায় কিন্তু আমি আর ওগুলো নিতে পারিনি। ব্রেকাপ ছিল ফাইনাল ডিসিশন। তবুও আমাদের প্রায় ৩/৪ মাস ধরে কথা হতো। সপ্তাহে একদিন দুদিন। এখন আর হয়না। আমি তখন থেকে খুবই অসহায় বোধ করি। আমি ছেলে হওয়া স্বত্তেও প্রচুর কান্না করি প্রতিনিয়ত। ব্রেকাপের ৭/৮ মাস পরে এসেও নিজেকে খুব অসহায় আবিষ্কার করি।

২. ঠিক এই মুহূর্তে আমার সবকিছুই আছে। বাবা মা পরিবার পরিজন আত্মীয় স্বজন। টিউশনি করার জন্য পর্যাপ্ত টাকাও আছে। সকলের অফুরান ভালোবাসাও আছে। তবুও কী যেন নেই। প্রতিটি দিন আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। রাত হলেই এসব ধরা দেয়।

৩. ক্যাম্পাস বন্ধ থাকাটাও একটা সমস্যা। বাসায় থাকার জন্য খুবই বোরিং লাগে।

৪. একজন পরামর্শ দিয়েছিল এখন নতুন করে রিলেশনে যেতে। গত কয়েক মাসে ৭/৮ টা প্রোপোজাল পেয়েছি। কিন্তু কেনো যেনো কারো প্রতিই আমার ফিলিংস নেই। আমি আবার সবকিছু শুরু করতে পারি এটা আমি ঠিক কল্পনাও করতে পারছি না।

বি.দ্রঃ ওই মেয়েটার সাথে আর কখনোই রিলেশনে যেতে চাইনা।

💌 মনচিঠি টেক্সট-৩৬ এর উত্তর

DUOS-এর ‘মনচিঠি’তে সাহায্য চাওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি । আপনার চিঠিটি আমি মনোযোগ দিয়ে ও ধৈর্য সহকারে পড়েছি এবং আপনাকে উত্তর দিতে পেরে আনন্দবোধ করছি।

আপনি অনেক সুন্দর করে পয়েন্ট আকারে আপনার মনের কথাগুলো চিঠিতে লিখেছেন।

আপনার লিখা থেকে বুঝতে পারলাম যে, আপনি যাকে ভালোবাসতেন সে আপনিসহ আরো কয়েক জনের সাথে সম্পর্কে জড়িত ছিলো। আপনি সেটা জানতে পারার পর আপনাদের সম্পর্কের ইতি টানেন।

আরো বুজতে পারলাম যে, আপনি তাকে ক্ষমা করতে পারছেন না এবং আপনার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন ও তার সাথে আর রিলেশনে যেতে চান না। মাঝে মধ্যে আপনি তার (আপনার গার্লফ্রেন্ডের) সাথে কথা বলতেন, কিন্তু এখন কথা না বলায় আপনার একাকী লাগে এবং অসহায় বোধ করেন। কান্নাও করেন।

প্রথমেই বলি, ছেলে হলে যে কান্না করা যাবে না সেটা কিন্তু না। আবেগ/অনুভূতি সবারই থাকে, সেখানে ছেলে/মেয়ে আলাদা কিছু নেই। আনন্দ, কষ্ট, রাগ ইত্যাদি অনুভূতি আমাদের জীবনেরই অংশবিশেষ, কান্না তার একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

আপনার পরিবার-পরিজন/আত্মীয় স্বজন সবাই থাকা সত্বেও আপনি যখন একাকী হন (বিশেষ করে রাতের সময়) তখন আপনার অতীত স্মৃতি মনে হয় কষ্ট হয়। আপনার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বিশ্বস্ত কারোর সাথে শেয়ার করলে আপনার মনের কষ্ট অনেকটা কমবে বলে আমি মনেকরি। সেই সাথে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার কারণে আপনার অসহ্য লাগে।

সব কিছু থাকার পরেও আপনার কি যেনো নেই, সেই চিন্তা করেন। ওই সময় ইমোশনাল ব্রেন বেশি কাজ করে ও লজিক্যাল ব্রেন কম কাজ করে।

(আপনি বলছেন প্রতিটি দিন আপনাকে কুড়ে কুড়ে খায়) ওই সময় আপনার মনে ঠিক কী কী ধরনের চিন্তা আসে সেটা জানলে উত্তর দিতে সুবিধা হতো, যেহেতু চিন্তাগুলো আপনাকে কষ্ট দেয়, ধরে নিলাম এগুলো নেতিবাচক চিন্তা। {এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত মাত্র, ব্যাতিক্রম কিছু থাকলে সংশোধন করে দিবেন এং ক্ষমা করবেন।}

আমরা যখন কোন কিছু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করি, তখন আমাদের সমস্যাটি সমাধানের জন্য ঠিক কী প্রয়োজন, সেই ব্যাপার থেকে আমাদের ফোকাসটি সরে যায়৷ আর আমরা আরও বেশি করে সমস্যায় জড়িয়ে পড়ি।

ঐ সময় সর্ব প্রথম আপনাকে যা করতে হবে তা হলো মনকে শান্ত করা। সেজন্য আপনি নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান করতে পারেন। এগুলো আমাদের মনকে শান্ত রেখে আমাদের মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

মনোবিজ্ঞানে একটা শব্দ রয়েছে- মাইন্ডফুলনেস। মাইন্ডফুলনেস হলো দেহের এমন একটা পর্যায়, যেখানে আমাদের দেহ মস্তিষ্কের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে দেহকে একটা সুস্থির অনুভব দান করে। এই মাইন্ডফুলনেসই মূলত মেডিটেশনের সংজ্ঞা উপস্থাপন করে। সোজা বাংলায় বললে, মেডিটেশন হলো মানবদেহ, মন ও মস্তিষ্ককে শান্ত ও শিথিল করার একটি চর্চাসরূপ। এটিকে একধরনের ব্যায়ামও বলা যায়। তবে এটি আর ১০টি ব্যায়ামের মত দেহের মাংসপেশির বিকাশ ঘটায় না, বরং এই ব্যায়াম অল্প সময়ের জন্য হলেও ব্যাক্তি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ও শূন্য মস্তিষ্ককে আরও বেশি একাগ্র হতে ধাবিত করে।

কম্পিউটার চালানোর সময় উইন্ডোজ ধীরগতি হয়ে গেলে আমরা যেমন মাউসের রাইট ক্লিক করে উইন্ডোজকে রিফ্রেশ করে নিই, ঠিক তেমনি মেডিটেশন আমাদের দেহের জন্য কম্পিউটারে রিফ্রেশ বাটনের মত কাজ করে।

ইউটিউব বা গুগলে অসংখ্য মেডিটেশন এর টিউটোরিয়াল রয়েছে। সেখান থেকে আপনি আপনার পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক অনুশীলন বেছে নিয়ে সেগুলো চর্চা করতে পারেন। মানসিকভাবে স্থির থাকার জন্য আমরা সব সময় Breathing Exercise করার কথা বলে থাকি।

এজন্য আপনাকে প্রথমে লম্বা করে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হবে, কিছুটা সময় তা ধরে রাখতে হবে (৪/৫ সেকেন্ড), তারপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে প্রশ্বাস ছাড়তে হবে। এভাবে আপনি ৩/৫ বার এই ব্যায়াম করবেন। এই ব্যায়াম আপনার বুক ধড়ফড় ও অস্বস্তি ভাব কমাতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও আরো ভালো ভাবে বুঝার জন্য আপনি একটি ভিডিও দেখতে পারেন – “https://youtu.be/u6zGTgrO90Y”

আপনি যখন বোর ফিল করেন (বিশেষ করে রাতে) তখন যেকোন ধরনের একটিভিটি করতে পারেন। এতে আপনার দেহ ও মন দুইটাই ভালো থাকবে । নিজের শখ ও ভালোলাগার কাজগুলো করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন যাতে মন ভালো থাকে। সেই সাথে একাকীত্ব কমে যায়।

আগে যে সময়টায় আপনি তার (আপনার গার্লফ্রেন্ডের) সাথে কথা বলতেন, সেটা একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এখন এই সময় ঐ কাজটা না করায় মনে একটা অপ্রাপ্তি কাজ করে । আপনি যদি সেই সময় অন্য কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন তাহলে আপনার পজিটিভ চেঞ্জ আসবে আশাকরি।

আপনি নতুন কোনও রিলেশনে যেতে চাচ্ছেন না, তার কারণ হিসেবে কি বলা যায় যে, আপনি আপনার সেই গার্লফ্রেন্ডকে ক্ষমা করতে পারছেন না। আপনি তার জন্য না, আপনার নিজের ভালো থাকার জন্য তাকে ক্ষমা করা দরকার বলে আমি মনেকরি। অতীতের ঘটে যাওয়া সব ঘটনাকে মেনে নিয়ে নিজেকে ও তাকে ক্ষমা করা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত হবে বলে আমি মনে করি।

নতুন করে রিলেশনে যাওয়াটা সম্পূর্ণ আপনার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল, আপনার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য (মুভ অন করার) এটা একটা মাধ্যম হতে পারে। আপনার পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব অনেকেই আছেন, যারা আপনাকে পছন্দ করে, স্নেহ করে ও ভালোবাসে। আপনি চাইলে তাদের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটাতে পারেন। ইংরেজি তে একটা প্রবাদ আছে- “Time Heals All Wounds.”

তিনটা পয়েন্ট বলি, সেগুলো বিবেচনা করে দেখবেন-
১. আপনি যা পরিবর্তন করতে পারবেন না কেবল তা নিয়ে চিন্তা করা কতটা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি যা করতে পারবেন তাতে মনোনিবেশ করুন । আপনি যদি কোন কিছু পরিবর্তন করতে না পারেন, তবে এই বাস্তবতাটি গ্রহণ করুন ।
২. আপনার যা কিছু আছে, যেমন- অনেকগুলো অর্জনের কথা বলেছেন, অনেক রিসোর্স রয়েছে, পরিবার-বন্ধুবান্ধব, এগুলোসহ এই পর্যন্ত যত অর্জন আছে তার জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করুন ।
৩. আপনার লক্ষ্য ও স্বপ্ন পুরনের দিকে অগ্রসর হন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহন করুন ।

রাতে পরিমিত ঘুম ও দৈনিক কিছু শারীরিক ব্যায়ামের অভ্যাস তৈরি করতে পারেন, এগুলো আমাদের মন ও শরীর উভয় শান্ত ও ভালো রাখতে সহায়তা করে। আপনার লেখা অনেক গোছানো, তাই নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। প্রতিদিন লেখার অভ্যাস থাকলে আপনার মন হালকা হবে এবং ভালো বোধ করবেন।

আপনি সরাসরি একজন মনোবিজ্ঞানীর সাথে যোগাযোগ করলে ভালো হয় , যিনি আপনার সমস্যা শুনে কিভাবে আপনার জীবনকে আরও সুন্দর করা যায় সে ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করবেন। এছাড়াও আমাদের ‘মনচিঠি’ টিম সব সময় আপনাদের পাশে আছে। যে কোন প্রয়োজনে আমাদেরকে লিখতে পারেন।

মোঃ মোজাম্মেল হক তায়েফ
২০-০২-৩১, পিয়ার কাউন্সেলর, মনচিঠি by DUOS
mmh.decp8.du@gmail.com

📞 ভয়েস কলে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল আইডি, ফেসবুক পেজ এবং সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *