বিনামূল্যে অনলাইনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছে ঢাবি অপটিমিসটিক সোসাইটির ‘মনচিঠি’

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বাসাবন্দি সময়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হতাশা, ভীতি ও আতঙ্কের মাঝে অনলাইনে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপটিমিসটিক সোসাইটি ‘মনচিঠি’ শিরোনামে ২০২০ সালের মে মাসে এই বিভাগটি চালু করেছে।

অনলাইনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সেকশন ‘মনচিঠি’র সুপারভাইজর হিসেবে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল & কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারপার্সন এবং টিএসসির ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের পরিচালক, একই সাথে ক্লাবটির মডারেটর প্রফেসর ড. মেহজাবীন হক।

ঢাবি অপটিমিসটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘মনচিঠি’র সমন্বয়কারী মুখলিসুর রহমান মাহিন জানান, লকডাউনে অনেকদিন ঘরবন্দি থাকা বা সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মানতে গিয়ে অনেকের মাঝেই মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এমনকি মৃত্যু আতঙ্কও তৈরি হচ্ছে। অনেকেই আবার পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়া, চাকরি হারানো, ব্যবসায়িক মন্দা বা উপার্জন হারানোর দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। ‘মনচিঠি’ তাদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ক্লাবটির সভাপতি ইমতিয়াজ খান আসিফ বলেন, আমরা আশা রাখি; যারা আমাদের ‘মনচিঠিপ্ল্যাটফর্ম থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিচ্ছেন তারা সামান্য হলেও মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছেন।

সাধারণ সম্পাদক ফারহানা খান রিতু জানান, অনলাইনে মানসিক সহায়তার জন্য তৈরি গুগল ফরম পূরণ করে ভয়েস কল এবং লিখিত উত্তরের মাধ্যমে আমরা মানসিক সহায়তা দিচ্ছি। এছাড়া ক্লাবের ইমেইল আইডি, ফেসবুক পেইজ এবং সেলফোন নম্বরসহ যেকোনভাবে মানসিক চাপ/দুশ্চিন্তা/সমস্যার কথা জানালে ‘মনচিঠি’র দক্ষ কাউন্সেলর টিম আন্তরিকতার সাথে শোনেন এবং যত্নের সাথে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি, এডুকেশনাল & কাউন্সেলিং সাইকোলজি এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা ‘মনচিঠির কাউন্সেলর এবং পিয়ার কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করছেন।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও অনলাইনে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বিষয়ক ‘মনচিঠি’ বিভাগটি বছরব্যাপী চালু থাকবে।

সহায়তা প্রত্যাশীরা নিজেদের সকল তথ্য গোপন রেখেও ‘মনচিঠি’তে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।

‘মনচিঠি’তে দেয়া মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রত্যাশী সকলের তথ্যই নিরাপদ।

💌 অনলাইন চিঠি ও উত্তরের (টেক্সট) মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ‘মনচিঠি’তে লিখতে হবে।

📞 ভয়েস কলে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

☎️ হটলাইন নম্বরে ফোনকলের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল আইডি, ফেসবুক পেজ এবং সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের’ চর্চা করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ

শিক্ষা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা এ সবকিছু থাকার পরও একটি মানুষ নেতৃস্থানীয় পদে আসীন হয়ে অসফল হতে পারে, যদি না তার নিজের আবেগ, চাপ ও আশেপাশের মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে ইতিবাচক শক্তিতে পরিচালিত করতে না পারে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের এই নতুন ধারনাটি আমাদের মাঝে ১৯৯০ সালে নিয়ে আসেন আমেরিকার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের দুই অধ্যাপক, জন ডি মায়ের ও পিটার সালোভে।

তবে এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয় তারও বছর দশেক পরে। বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন এমন অনেকে আছেন যারা তাদের আবেগ, চাপ সবকিছু নানা প্রতিকূলতার মাঝেও নিয়ন্ত্রণ করে দলবল সঙ্গী করে বিশ্বের কাছে নিজেদের তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশ এই মুহূর্তে যে কটি দুর্যোগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে তার একটি হলো, কোন রোল মডেল না থাকা। কিন্তু সার্বিকভাবে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে কেউ যদি থেকে থাকে তবে তিনি সাকিব আল হাসান।

সাকিবই বিশ্বের প্রথম যিনি তিন ধরনের ক্রিকেটেই অলরাউন্ডার হিসেবে ঘোষিত হন, যা একটি বিরল দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি ক্রিকেট বিষয়ক মাসিক পত্রিকা উইজডেন তাকে এক দিনের ক্রিকেটে শতাব্দীর দ্বিতীয় সেরা ক্রিকেটার হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সাকিব আল-হাসান

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জগতে সাকিব দেশের জন্য যে পরিমাণ সম্মান নিয়ে এসেছেন তা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি বললে ভুল হবে না। কিন্তু কীভাবে সমস্ত চাপ, দুশ্চিন্তা প্রতিকূলতাকে পাড়ি দিয়ে নিজের পারফরমেন্স দেখানোর পাশাপাশি সতীর্থদেরকেও সঙ্গে করে এই পর্যায়ে আসা- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তার জন্য যে কোন চাপ একধরনের উৎসাহ হিসেবে কাজ করে।

”আমাকে চ্যালেঞ্জ করা হলে আমি আরো উদ্দীপনা অনুভব করি। আর এর থেকে উতরে আসার একমাত্র উপায় নিজের পারফরম্যান্স দেখানো। আমি জানি আমার উদ্দেশ্য কী। আর সেই লক্ষ্যে আমি কাজ করে যাই,” তিনি বলেন।

মাত্র সতের বছর বয়সে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন একদিন তার কোচ তাকে বলে, কাল থেকে আর হাত খরচের টাকা বাসা থেকে নিও না! সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সাকিব বাসা থেকে কোন আর্থিক সাহায্য নেন নি।

বরং ওই কিশোর বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন- তাকে তার ও তার পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। এরপর বাকিটা ইতিহাস!

তার পরিবার, বন্ধুরা তার জন্য একটি নি:শ্বাস নেয়ার জায়গা, যেখানে কেউ তার সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে কথা বলে না। তিনি পত্রিকা পড়েন না। পাবলিক ফিগার হিসেবে অনলাইন ট্রোলিং বা বুলিং তাকে প্রভাবিত করে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ”মানুষ কী ভাবে তাও যদি আমি ভাবি তাহলে মানুষ কী ভাববে!”

ঠাণ্ডা মাথায় কঠিন সিদ্ধান্ত

সাকিবকে সবসময় শুধু ঠাণ্ডা মাথায় কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায় তাই নয়, নিজেকে, দলকে এবং দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সুশীল। এই গুণ তিনি কীভাবে রপ্ত করছেন জানাতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ”আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলার সুযোগ সবচেয়ে বেশি আমারই হয়েছে যেমন কাউন্টি বা আইপিএলে খেলা। এই পরিবেশ আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।”

সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করা সাকিব যেন এক জীবনে সবকিছু পেয়েছেন। সেই তিনি কিছুদিন আগে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটিও পেয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল তাকে এক বছরের জন্য ক্রিকেট থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

”আমার মনের জোর অনেক বেশি। এই ঘটনার পর আমাকে দেখে আমার আশেপাশের মানুষের বোঝার ক্ষমতা নেই আমার সঙ্গে কী হয়েছে। আমি যেকোনো সময় আমার জীবনকে শূন্য থেকে শুরু করার সাহস রাখি,” তিনি বলেন।

”আমি বিশ্বাস করি যতক্ষণ পর্যন্ত শারীরিকভাবে সুস্থ আছি, আমার আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে পারবো। আগে হয়ত ভাবনা ছিল আর তিন বছর খেলবো। কিন্তু এই ঘটনা আমাকে সাহস যুগিয়েছে, এখন আমি আরো পাঁচ বছর খেলবো,” বলেন সাকিব আল-হাসান।

ইয়াসির আজমান

এই বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশিকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করলো গ্রামীণফোন, যা কিনা পৃথিবীর অন্যতম সফল টেলিকম সংস্থা টেলেনর এর অঙ্গ সংগঠন। কোন বাংলাদেশির প্রধান নির্বাহী হওয়া নিয়ে এতোটা হইচই আগে কখনো হয়নি, যতোটা হয়েছে ইয়াসির আজমানকে নিয়ে।

টেলিকমিউনিকেশনের মতো প্রযুক্তি নির্ভর, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মুখোমুখি একটি বৈদেশিক সংস্থার প্রধান-এর পদ তিনি নিজেকে কী কী গুণের কারণে জয় করেছেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ”আমি সবসময় মানুষের ব্যাপারে আগ্রহী, নতুন কিছু শেখার ব্যাপারে আগ্রহী, সেই সঙ্গে চেষ্টা করি উদ্দেশ্য ঠিক করে মানুষের সঙ্গে সমষ্টিগত মেলবন্ধন তৈরি করতে যা আমাকে সবসময় সাহায্য করেছে।”

ডিস্ট্রিবিউশন মডেল পুনর্বিন্যাস প্রকল্প

ইয়াসির আজমান জীবনে অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন নেতাদের জীবনী পড়ে। তিনি চেষ্টা করেন তার আশেপাশের ছোট হোক বড় হোক সবাইকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে। যা তাকে সাহায্য করে প্রতিটি মানুষকে দৃষ্টিসীমানার মাঝে তাদের দেখতে – যেখানে কেউ ছোট-বড় নয়।

পারস্পরিক সেই শ্রদ্ধাবোধ তখন কাজের গুণগত মানকে আরো অনেক বেশি বাড়তে সাহায্য করে তার জন্য।

দু’হাজার সাত-আট সালের দিকে প্রায় ৫০০-৬০০ সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামীনফোনের ডিস্ট্রিবিউশন মডেলের পুনর্বিন্যাস প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রকল্পটি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তা সফল না হলে গ্রামীনফোন প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে পিছিয়ে যেত। মাত্র ছ’সাত মাসে সবাইকে নিয়ে এক অসাধ্য সাধান করেন তিনি।

তৎকালীন প্রধান নির্বাহী তাকে ব্যক্তিগতভাবে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু তিনি তা নিলেন না। তিনি মনে করেছিলেন এটি প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি কর্মীর জয়।

তবে তার সেই নেতৃত্বই হয়ত আজ তাকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে সাহায্য করেছে। আর তার জন্য পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রস্তুতির কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। সেই ক্ষেত্রে ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স করা জানাতে পারাও অনেক জরুরি।

মানুষের ক্ষমতা অপরিসীম বলে মনে করেন ইয়াসির আজমান। তিনি নিজেও এখনো প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন। নতুনদের সঙ্গে কথা বলতে, কাজ করতে তা খুবই জরুরি। বিশেষ করে এই করোনার সময়ে যখন বইয়ের ভাণ্ডার পুরনো কথা বলে, অনলাইনে তখন প্রতিদিন অন্তত দু’টো লেখা পড়েন বর্তমান সময়ের পৃথিবীকে নিয়ে।

হাসিন জাহান

প্রায় ত০ বছর ধরে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে নারীরা। এটি পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকার, বিরোধী দল এবং সংসদের স্পিকার একজন নারী। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে নারী নেতৃত্ব এখনও অনেক দূরের বিষয় বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে খুব কম নারীই কর্পোরেট বা সামাজিক উন্নয়ন জগতে নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। তাদেরই একজন আন্তর্জাতিক এনজিও ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান।

ব্যক্তিগত আর পেশাগত জীবন আলাদা

পারিবারিক দিক থেকে কোন সহযোগিতা ছাড়াই যিনি নিজেকে নিয়ে এসেছেন এ পর্যায়ে। কিন্তু তা তিনি কীভাবে পেরে উঠছেন জানতে চাওয়া হলে বলেন, যদিও মানুষের আবেগ থাকাই স্বাভাবিক, তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনকে বা তার কোন সমস্যাকে পেশাগত জীবনে কোন প্রভাব ফেলতে দেন নাই।

”বরং অনেক পুরুষের চাইতেও অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি,” তিনি বলেন।

হাসিন জাহান যেকোনো বিষয়েই প্রচুর প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন। তিনি মনে করেন পরবর্তী প্রজন্ম জ্ঞানের দিক থেকে আরো বেশি অগ্রসর হয়ে থাকবে। মনোযোগ, উপস্থিত বুদ্ধি এইসব কিছুর সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি যদি থাকে তবেই সাফল্য সম্ভব।

”জীবনে সবকিছুতে জিততে হবে এমন মানসিকতা না থাকাই ভালো। মাঝে মাঝে ব্যর্থতারও দরকার আছে। বরং না পাওয়ার কথা ভেবে যা পেয়েছে তাই নিয়ে কৃতজ্ঞ হলে প্রাপ্তির আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব,” বলেন হাসিন জাহান।

শেহজাদ মুনিম

কর্পোরেট জগতে যদি কোন প্রতিষ্ঠানের নাম নিতে হয়, তবে সবার আগে নাম আসে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর। ইম্পেরিয়াল টোবাকো নামে পূর্বপরিচিত এ প্রতিষ্ঠানটি গত ১১০ বছর ধরে এই অঞ্চলে শুধু ব্যবসা করে আসছে তাই নয়, কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দক্ষ কর্মী উপহার দেয়ার কৃতিত্বও তাদের।

এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকে বিদেশীদের নেতৃত্বেই চলে আসছিল। তবে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই চিত্রটি পাল্টে দেন শেহজাদ মুনিম ২০১৩ সালে।

এই রোল মডেল হীন এমনি একটি সময় সম্প্রতি তিনি অতিবাহিত করে চলেছেন। লক-ডাউনের সময় তার কারখানা খোলা রেখেছেন সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কারাখানায় শ্রমিকদের মাঝে।

এমনকি ঈদের দিনের রাতের খাবারও তিনি খেয়েছেন কারাখানায় শ্রমিকদের সঙ্গে বসে অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে। কাউকেই তার চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে হয়নি।

ফজর থেকে দিন শুরু

ভালো মানুষদের সবসময় নিজের চারপাশে ধরে রাখা, উদ্দেশ্য ঠিক রাখা এবং মন মানসিকতাকে সংকীর্ণ না রাখা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেহজাদ মুনিম।

”জীবনে রোল মডেল থাকা অনেক প্রয়োজনীয়। যাকে অনুসরণ করা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে রোল মডেলের পরিবর্তন ঘটে। আবার এমন এক সময় আসে যখন সেক্ষেত্রে কোন রোল মডেল খুঁজে পাওয়া যায় না যাকে অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। সেক্ষেত্রে উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার থাকা উচিত.” মি. মুনিম বলেন।

নিজের আবেগ, অনুভূতি, মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন তার ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োগের কথা। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন এর ভিন্ন একটি দিক।

”একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ফজর থেকে যোহর অনেক লম্বা সময়। এই সময়টায় দেরী করে ঘুম থেকে না উঠে ফজর থেকেই দিন শুরু করা উচিত,” তিনি বলেন।

”আমাদের মস্তিষ্কও তখন সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে সক্রিয় থাকে। যা জরুরি সকল কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।

”বিকেলে আসরের পর সহকর্মীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, যা সামাজিক নৈকট্য তৈরি করে। মাগরিবের পর কোনভাবেই অফিসে না থাকা। বরং পরিবারকে সময় দেয়া, বলেন শেহজাদ মুনিম।

এ কে এম আব্দুল কাইয়ুম

পৃথিবীতে অন্যতম বিপদজনক ও চাপ প্রয়োগকারী পেশা হলো বিমানের পাইলট। শুনতে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয় এই পেশা ততটাই সতর্কতা গ্রহণের চাহিদা নিয়ে আসে। আর তার জন্য চাই প্রতিটি মুহূর্তের শতভাগ মনোযোগ।

কারণ এখানে শুধু নিজের নয়, বহ মানুষের জীবন জড়িত একজন পাইলটের হতে। আর তাই নিরবিচ্ছিন্নভাবে বহু ঘণ্টা ধরে মনোযোগ ধরে রেখে বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে পাড়ি দেয়া এতো সহজ নয়।

”এই পেশায় সফল হতে গেলে কাউকে অবশ্যই কিছুটা বেশি বুদ্ধিমান, পরিপক্ব ও জ্ঞানী হওয়া প্রয়োজন যেকোনো সমস্যার গভীরতা বোঝার জন্য। তবে কে কীভাবে একটি সমস্যাকে সমাধান করবে তা ব্যক্তি নির্ভর,” বলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অবসরপ্রাপ্ত বৈমানিক এ কে এম আব্দুল কাইয়ুম।

স্ত্রীর ক্যান্সার

মানুষের ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে অনেক সমস্যাই থাকে। কিন্তু তার মাঝেও বিমান নিয়ে উড়াল দিতে হয় একজন পাইলটকে।

”আমার স্ত্রী ক্যান্সারের রোগী ছিল। যেহেতু এটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ তাই আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না বারবার স্ত্রীর জন্য ছুটি নেয়া। এমনও হয়েছে স্ত্রীকে হাসপাতালে কেমো দিতে বা অপারেশন করতে পাঠিয়ে আমি অন্যদিকে বিমান নিয়ে রওয়ানা দিয়েছি। সমস্ত দুশ্চিন্তাকে সামাল দিয়েই তা করতে হয়েছে,” তিনি বলেন।

”বেশি দুশ্চিন্তা ফ্যাটিগ তৈরি করে। যা একবার হয়ে গেলে আর বিমান চালানো সম্ভব না। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতেই মাথা ঠাণ্ডা রাখাই একমাত্র উপায়,” তিনি বলেন।

বৈমানিকদের এই মানসিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্যই বিশ্বজুড়ে ‘ক্রু রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ বলে একটি কোর্স রয়েছে যা প্রতি দু’এক বছরেই করতে হয়। এছাড়াও আরো কিছু কোর্স রয়েছে যা প্রতি ছ’মাসে করতে হয়।

মি. কাইয়ুম বলেন, এই কোর্স শুরু করার এক সপ্তাহ আগে থেকেই তিনি পড়াশোনা শুরু করেন যাতে সবার সঙ্গে এগিয়ে থাকতে পারেন।

আমাদের দেশে হয়ত একজন শেহজাদ মুনিম, এ কে এম আব্দুল কাইয়ুম, হাসিন জাহান, ইয়াসির আজমান এবং সাকিব আল হাসানের মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু কেউ যদি তাদের মতো করে নিজেদের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সকে চর্চা করে – তবে এই সংখ্যাটি বাড়তে অবশ্যই বেশি দিন লাগবে না, এইটুকু আশা আমরা করতেই পারি।

নওরীণ সুলতানা
লেখক, টরন্টো
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

📮 সারারাত না ঘুমিয়ে চলে যায়

💌 মনচিঠি-০৮ (টেক্সট)

আমার রাতে ঘুম হয় না। সারারাত না ঘুমিয়ে চলে যায়। বিকেলে যদি না ঘুমিয়ে খেলাধুলা করে ক্লান্ত হয়ে যাই তারপর সন্ধ্যায় ৩০/৪০ মিনিটের জন্য ঘুমাতে পারি। তার বেশি ঘুম হয় না। এই সমস্যা বিগত ২ বছর ধরে হচ্ছে। যদি সমাধান দেওয়া যায়, উপকৃত হবো।

📮 মনচিঠি টেক্সট-০৮ এর উত্তর

প্রথমেই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি এখানে আপনার মতবাদ ব্যক্ত করার জন্য এবং খুব সংক্ষেপে স্পষ্ট করে নিজের বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ করার জন্য।

আপনার লেখা থেকে যতটুকু বুঝতে পারছি যে আপনার মধ্যে কিছু ইনসমনিয়ার লক্ষণ আছে এবং আপনি প্রায় ২ বছর ধরে ভুগছেন। একজন মানুষের দৈনিক কত ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয় এর কোন সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই, যেমন অনেকে রাতে অনেক কম ঘুমিয়েই পরের দিন বেশ সতেজ অনুভব করেন আবার কার কারো বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়।

ইনসমনিয়ার কিছু সাধারণ কারণঃ

১. স্ট্রেস
২. লম্বা সফর বা ট্রাভেল, অতিরিক্ত কাজের সময় কিংবা ওয়ার্ক শিডিউল
৩. ঘুমের অভ্যাস এবং এর ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়া (টিভি দেখা, ভিডিও গেম, রাত জেগে ফোনে ব্যস্ত থাকা, পড়াশোনা করা ইত্যাদি।)

আপনার সুবিধার জন্য আমি স্লিপ হাইজিনের কিছু তথ্য শেয়ার করে সাহয্য করতে পারি।

ঘুম সহায়কঃ

১. প্রতিদিন কিছু শরীরচর্চা করা যেতে পারে (আপনি বিকালে খেলাধুলা করেন যা শরীরচর্চার অন্তর্ভুক্ত) কিন্তু তা অবশ্যই বিকালের দিকে করলে ভাল হয়। ঘুমানোর ২-৪ ঘণ্টা আগের সময়টাতে শারীরিক এক্সারসাইজ করলে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে।
২. ঘুমাতে যাওয়ার প্রথম ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না আসলে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে রিলাক্সিং কোন কাজ করা যেতে পারে, পরে ঘুমভাব চলে এলে বিছানায় ফেরত যাওয়া যেতে পারে।
৩. প্রতিদিন ঘুমানোর জন্য একই সময়ে বিছানায় যাওয়া এবং ঘুম থেকে একই সময়ে জেগে ওঠা, এই অভ্যাসটি গড়ে তুললে ঘুমের যে নিয়মিত চক্র কিংবা স্লিপ সাইকেল রয়েছে তা নিয়মিত হয়ে যাবে।
৪. বিকাল কিংবা সন্ধ্যাবেলা ১-১.৫ ঘণ্টা ঘুমালে ( যা চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন যে আপনি প্রায় সন্ধ্যায় ৩০-৪০ মিনিট ঘুমান) রাতে শোয়ামাত্র ঘুম আসাটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে।
৫. বিকালে কিংবা সন্ধ্যার নাস্তায় যদি ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করা হয় তবে রাতের ঘুমে তা বাধা প্রদান করতে পারে।
৬. যদি কেউ রেগুলার ঘুমের ওষুধ খায় তবে তা সাধারন ঘুমের সাইকেল ব্যাহত করে, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ খাওয়া নিরুৎসাহিত করা হল।
৭. ঘুমানোর ১-২ ঘন্টা আগে ভারী খাবার গ্রহণ করলে ঘুমে সমস্যা হতে পারে, বিছানায় যাওয়ার আগে হালকা স্ন্যাকস যেমন হালকা গরম দুধ পান করলে ঘুম আসতে সাহায্য করে।
৮. বিছানা শুধুমাত্র শোবার কাজে ব্যাবহার করুন এবং ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে প্রয়োজনীয় সমস্ত হাতের কাজ সেরে ফেলুন।
৯. ব্রেদিং এক্সারসাইজ কিংবা শ্বাস প্রশ্বাস এর ব্যায়াম যাকে বলি, তা ঘুমানোর আগে ৩-৪ মিনিট সময় নিয়ে করলে আমাদের শরীর অনেকটা রিল্যাক্স হয়, ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ে এবং মন মাইন্ডফুল থাকে যা আমাদের দুশ্চিন্তাগুলো থেকে ওই সময়টায় অনেকটা মুক্তি দেয়। ব্যায়ামটি করার পূর্বে নিজের শরীর কে শিথিল করুন, এরপর নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড ধরে লম্বা করে শ্বাস নিন (এমনভাবে শ্বাস নিন যেন কোনো ফুল থেকে নাক দিয়ে সুঘ্রাণ নিচ্ছেন) এবং ২-৩ সেকেন্ড যাবত শ্বাস আটকে রাখুন। এরপর মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে ৩-৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস ত্যাগ করন (এমনভাবে শ্বাস ছাড়ুন যেন মোমবাতিতে ফু দিয়ে আগুন নেভাচ্ছেন)। আপনার এজমার সমস্যা থাকলে শ্বাস নেয়া এবং ছাড়ার সময়টুকু কমিয়ে আনতে পারেন আপনার সুবিধা মত। এই ব্যায়ামটি আপনার ব্যস্ত মস্তিস্কে আরাম দেবে এবং ধীরে ধীরে ঘুমের অতল রাজ্যে হারিয়ে যাবেন।

উপরের ঘুম সহায়ক নিয়মাবলী মেনে চলার পরেও যদি আপনি কোন উন্নতি দেখতে না পান তাহলে সম্ভবত আপনার ভেতরে এমন কোন জটিলতা তৈরী হয়েছে যা আপনি একা সমাধামন করতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে আপনি কাউন্সেলর বা সাইকলজিস্ট কিংবা সাইকিয়াট্রিস্ট অথবা ঘুম বিশেষজ্ঞের কাছে পরামর্শ নিন। আপনার সমস্যার জট খুলে একে একে সমাধান করুন এবং আরাম করে ঘুমান।

মেহরিন মুস্তফা মুমু
৩১, পিয়ার কাউন্সেলর, মনচিঠি, ডিইউওএস
mehrinmostafa@gmail.com

💌 অনলাইন চিঠি ও উত্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ‘মনচিঠি’তে লিখতে হবে।

📞 ভয়েস কলে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

☎️ হটলাইন নম্বরে ফোন করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল, ফেসবুক পেজ, সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নেয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

📮 বারবার মনে হয় আমি মারা যাচ্ছি

💌 মনচিঠি-০৭ (টেক্সট)

২০১০ সাল। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। আমার খুব কাছের বন্ধুর মা হঠাৎ করে মারা গেলেন। আন্টিকে আমি প্রায়শই স্কুলে দেখতাম, কথাও হতো। তার এরকম হঠাৎ মৃত্যুর ব্যাপারটা আমাকে বেশ নাড়া দিলো। আমি তখন ই প্রথমবারের মতো মৃত্যু নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করতে শুরু করলাম। আর একটা জিনিস খুব শক্ত করে মাথায় গেঁথে গেলো- ‘আমাকেও একদিন মরে যেতে হবে!’

মাসখানেকের ব্যবধানে আমার মনের অবস্থার আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়ে গেল। আমার সারাদিন ই মনে হতে থাকতো আমি মারা যাব। প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার এভাবে কাটতো। আমার আচরণে অনেক পরিবর্তনও আসে। আমি যেহেতু মুসলিম পরিবারের সন্তান, তাই আমি ধর্মীয় বিষয়টাকে কেন্দ্র করে ভাবতাম। আমি ভাবতাম- ‘পৃথিবীতে এই ১০ বছরে তো আমি অনেক পাপ করে ফেলেছি। এই পাপের শাস্তি তো অনেক! আর তাছাড়া আমাকে তো মরতে হবেই।’

একপর্যায়ে এমন মনে হতো যে- ‘আমি এখনই মারা যাবো! আমি কালই মারা যাবো!’ এই ভেবে প্রায় সব ছেড়ে দিয়েছিলাম প্রায়। মৃত্যুচিন্তা আমাকে সারাক্ষণ কষ্ট দিতো।

সেবার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্কুল শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমি সেরে উঠি। তারপর আর ওই চিন্তাটা প্রকটরূপ নেয় নি।

তবে ২০২০ সালে এসে করোনার প্রভাবে দীর্ঘ ৩ মাসের বেশি লকডাউনে থেকে এবং আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে করতে আমাকে অন্য সমস্যায় ধরে বসেছে।

তার আগে আমি আমার দুশ্চিন্তার কারণগুলো বলি-
• আমার জেলায় প্রথম থেকেই আক্রান্তের সংখ্যা বেশি
• প্রতিনিয়ত দেশের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে আমি এবং আমার পরিবার কিভাবে বাঁচবো- এই নিয়ে একটা চিন্তা
• আমার বাবা মালয়েশিয়া প্রবাসী। তাকে বাইরে কাজ করতে বের হতে হয়। তাকে নিয়েও আমি বেশ চিন্তগ্রস্থ থাকি।

এই সব কিছুর প্রভাবে (শারীরিক কিছু কারণও আছে বটে যেমনঃ রাতজাগা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা) রমজান মাসে একদিন সেহেরির পর আমার শরীর খারাপ করে। তখনকার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা-
• বুক ধরফর করা (খুব বেশি না)
• শরীর অবশ হয়ে আসা
• গলা শুকিয়ে যাওয়া
• আর সবচেয়ে বেশি যেটা অনুভূত হওয়া- আমি এখনই মারা যাচ্ছি!

সেদিন সুস্থ হলেও প্রায় প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ই আমাকে অজানা আতঙ্কে ধরে বসতে শুরু করে। বুকটা ধপাস করে উঠে আর মনে হয় – এখনই মারা যাবো! খুব ভয় করে তখন।

আমি ইন্টারনেটে খোঁজ করে জানতে পারি – এটা প্যানিক এটাকের মতো কিছু। তাই মেডিটেশন আর ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা দিয়ে পরিস্থিতিটাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সমস্যাটা কমতে থাকে। তবে ১/২ দিন পর পর সমস্যাটা কিছুটা হয়।

গতকয়েকদিন আগে থেকে আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাই। এবং সাথে সাথে আবার সেই পুরোনো ‘ডেথ ফিয়ার’ সমস্যাটাও প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, আমার ছোটখাটো শারীরিক সমস্যা ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। যখন সমস্যাটা হয়, তখনকার মানসিক অবস্থা-
• হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত না হলেও, কেমন যেন অস্বস্থি কাজ করে। দম বন্ধ হয়ে আসবে এমন মনে হয়।
• বার বার মনে হয় আমি মারা যাচ্ছি/যাবো
• কোন প্রকার কাজে মন দিতে পারি না।

সবকিছু সংক্ষিপ্ত আকারে দাড়ায়-
১. প্যানিক অ্যাটাক
২. মৃত্যু ভয়
৩. দুশ্চিন্তা

আমি এ সমস্ত চিন্তাভাবনা থেকে মুক্তি পেতে চাই!

📮 মনচিঠি টেক্সট-০৭ এর উত্তর

প্রথমেই অনেক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই আপনাকে DUOS মনচিঠির পাতায় সাহায্য চাইবার জন্য।

এটা খুব ইতিবাচক একটা দিক যে আপনি আপনার বর্তমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ভেবেছেন, নিজে কিছুটা চেষ্টা করেছেন এবং পরবর্তিতে আরো সাহায্যের জন্য মনচিঠির পাতায় জানিয়েছেন।

আপনার লেখা থেকে যতটুকু আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনার শৈশবের একটি অবদমিত অনুভূতি (মৃত্যুভয়), যা ঐসময় আপনি অন্যদের সাহায্যে কাটিয়ে উঠতে পারলেও তা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। সেই ভীতি আজ বিভিন্ন ট্রিগারের কারণে আবার আপনার মাঝে ফিরে আসছে। এই অবস্থায় আপনাকে সবচেয়ে ভালো সাহায্য দিতে পারেন একজন মনোবিজ্ঞানী যিনি Nuro Linguistic Programming বা EMDR থেরাপি চর্চা করেন। আপনি তেমন একজনের সাহায্য নিতে পারেন।

এছাড়া সাময়িক সমাধান পেতে আপনি Breathing Exercise করতে পারেন। প্রথমে লম্বা করে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হবে, কিছুটা সময় তা ধরে রাখতে হবে (৪/৫ সেকেন্ড), তারপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে প্রশ্বাস ছাড়তে হবে। এই ব্যায়াম আপনার বুক ধড়ফড় ও অস্বস্তি ভাব কমাতে সাহায্য করবে।

মৃত্যুভীতি আমাদের এক ধরনের দুঃশ্চিতার ফলাফল। আপনি আপনার এই দুঃশ্চিতার কারনগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। সেই কারনগুলো আপনার মধ্যে কি কি চিন্তার উদ্রেক ঘটাচ্ছে তা ভেবে দেখুন।

যদি ধরে নেই আপনার পরিচিত কারো মৃত্যুর খবর আপনি জানতে পারলেন এখন এর ফলে আপনার মধ্যে সেই ভীতি আবার কাজ করতে শুরু করলো আপনি ঐ মুহুর্তে ভাবতে শুরু করলেন আপনিও মারা যাবেন বা মারা যাচ্ছেন। আপনার এই ভাবনা আপনার মস্তিষ্ককে ভয়ের ম্যাসেজ পাঠাবে আর শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার বুক ধড়ফড় আর অস্বস্তির বোধ হবে।

এই সময় আপনি Imagery Relaxation প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে কিছুটা আরাম দিতে পারেন। আপনি আপনার জীবনের খুব আনন্দদায়ক কোন মূহুর্তের কথা তখন ভাবতে পারেন বা কোন হলিডে বা প্রিয় কোন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি মনে করতে পারেন যা আপনার মধ্যে অনেক ভালো লাগার অনুভূতি তৈরী করেছিল। এই ভালোলাগার অনুভূতিই আপনাকে আবার আরাম দিবে আর ধীরে ধীরে আপনার প্যানিক অবস্থার বোধকে কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

কিছুটা স্ট্যাবল অবস্থায় আসার পর আপনি ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবতে পারেন। যেমন আপনার যখন মৃত্যুভীতি প্রবল হচ্ছিল তখনই আপনার কি কি রিসোর্স আছে তা থেকে বের হয়ে আসার বা আপনার নিজেকে সুরক্ষিত রাখার কি কি উপায় আপনার আয়ত্তে আছে আর কিভাবে আপনি তা ব্যবহার করছেন এরকম কিছু ইতিবাচক ভাবনার চর্চা করতে পারেন।

পরিশেষে আবারো বলবো প্রফেশনাল কারো সাহায্য নিন এবং আশা করছি দ্রুত এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেন।

খালেদা ইয়াসমিন
সাইকোলজিক্যাল এক্সপার্ট, মায়ালোজি, ব্র্যাক
২৬, পিয়ার কাউন্সেলর, মনচিঠি, ডিইউওএস
bithikhaleda04@gmail.com

💌 অনলাইন চিঠি ও উত্তরের মাধ্যমে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ‘মনচিঠি’তে লিখতে হবে।

📞 ভয়েস কলে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং/মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে এখানে ক্লিক করে ফরমটি পূরণ করতে হবে।

☎️ হটলাইন নম্বরে ফোন করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করতে হবে।

👩‍⚕️ এ ছাড়াও ইমেইল, ফেসবুক পেজ, সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নেয়া যাবেঃ

👍 ফেসবুক পেজ (ক্লিক করুন)
💬 ফেসবুক মেসেঞ্জার (ক্লিক করুন)
📞 সেলফোন নম্বর : 01841 21 52 71
📧 ইমেইল আইডি : monchithi.duos@gmail.com

🌐 বিস্তারিতঃ www.duos.org.bd/monchithi

মানসিক রোগ যখন তোতলানো

পিন্টু সাহেব সারাদিন অফিস করে এসেছে। আজ আবার অফিসে কাজের প্রেশারটা একটু বেশিই ছিল। রুমে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো এসময় তার স্ত্রী এসে তার সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করেছে। কিন্তু তিনি কোনো কথারই উত্তর দিতে পারছিলেন না, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের কাজের পর তিনি যেমন ক্লান্ত, তেমনি কিছুদিন যাবৎ তিনি মানসিক বিষণ্নতায় দিন কাটাচ্ছেন। শারীরিক ভাবে কিছুটা দুর্বলও লাগছে তার। এগুলো তার কথা জড়িয়ে যাওয়া বা “তোতলামির” সাথে জড়িত। তবে এই তোতলামি চিরস্থায়ী না হলেও মাঝে মাঝে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

অনেকের মধ্যে তোতলামির কারণে কথা আটকে যাওয়ার একটি ভয় কাজ করে। এই ভয়ের কারণে কথা আরও বেশি আটকে যায়,একে “সেলিসমোফোবিয়া” বলে। এটি সম্পূর্ণ একটি মানসিক রোগ। এই রোগের কারণে কেউ কেউ সবার সামনে কথা বলতে পারে না। ভয় পায়। মনে করে, হয়তো কথা মুখ দিয়ে বের হবে না। তখন নিজেকে সবার সামনে লজ্জায় না ফেলার জন্য গুটিয়ে নেয়।

✓ Stuttering is a speech disorder characterized by repetition of sounds, syllables or words; prolongation of sounds; and interruptions in speech known as blocks. An individual who stutters exactly known what he or she would like to say but has trouble producing a normal flow of speech. These speech disruptions may be accompanied by struggle behaviors, such as rapid eyes blinks or tremors of the lips. [Source : Wikipedia]

• তোতলামি বলতে মূলত মুখের জড়তাকে বোঝায়। তোতলামি বিষয়টাকে আমাদের সমাজে অনেকটা হাসি তামাশার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। যেমন:কেউ কথা বলতে তোতলালে বা ক্লাসে কেউ পড়া দিতে গিয়ে আটকে গেলে আমরা তা নিয়ে হাসতে থাকি। এটা কারও কাছে সাময়িক মজার বিষয় হলেও, যার তোতলামি সমস্যা আছে তার জন্য এটা খুবই পীড়াদায়ক।

কারণ

তোতলামি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। এর পেছনে শারীরিক, মানসিক, পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ কাজ করে। অনেক সময় পরিবার থেকেও এটি পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, শিশুদের কথা বলায় অনেক সময় দেরি হতে থাকে, তখন মা-বাবা শিশুর উপর কথা বলার জন্য প্রেশার দিতে থাকে। তখন এই তোতলামির সৃষ্টি হয়ে থাকে।

সাধারণত মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের তোতলামির সমস্যা বেশি হয়। তোতলামির সমস্যা থাকা প্রতি পাঁচজন ছেলের বিপরীতে মেয়ে থাকে মাত্র একজন। পুরো পৃথিবীতে তোতলামি সমস্যায় ভুগছে এমন লোকসংখ্যা মাত্র ১%। [Source : Internet]

সৃষ্ট সমস্যা

•  ভাষাগত জটিলতা:
সাধারণত ২-৫ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে তোতলামির লক্ষণ দেখা যায়। তবে এটা হয়ে থাকে নতুন কথা বলা শেখার কারণে। নতুন নতুন শব্দ শেখা, এর সাথে পরিচয় হওয়া, নতুন শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করা- এগুলোর কারণে বাচ্চাদের তোতলামি দেখা যায়। নিজের ভাষার সাথে পরিচিত হয়ে গেলে কিংবা অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই তোতলামি চলে যায়। এক্ষেত্রে তোতলামির সমস্যাটা স্থায়ী নয়।

•  শারীরিক ও মানসিক জটিলতা:
অনেকের মধ্যে তোতলামির কারণে কথা আটকে যাওয়ার একটি ভয় কাজ করে। এই ভয়ের কারণে কথা আরো বেশি জড়িয়ে যায়। কথা আটকে যাওয়ার যে ভয় কাজ করে, তার পেছনে একটি রোগ দায়ী। একে সেলিসমোফোবিয়া বলে। এই রোগটি সম্পূর্ণ মানসিক রোগ।

•  পরিবেশগত জটিলতা:
ব্যক্তি কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে, তার উপর অনেকটাই তার মানসিক বিকাশ নির্ভর করে। তার বেড়ে উঠা আশেপাশের পরিবেশ যদি তার বিকাশে বাধা দেয়, তবে সে একজন ভীরু প্রকৃতির মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোনো ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস থাকে না। যেকোনো কাজে নিজে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। পরিবারের লোকদের সাথে সুসম্পর্ক থাকে না, তাই নিজেকে একা ভাবতে থাকে। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির জন্য অন্যের সাথে কথা বলতে ভয় পায়,যা থেকে তোতলামির সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।

অনেক সময় দেখা যায়, অনেকে ভেবে থাকে শিশুর মুখে পয়সা দিলে তোতলামি কমে। এজন্য পরিবারের সদস্যরা শিশুর মুখে পয়সা দিয়ে রাখে। কিন্তু এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু মুখে পয়সা দিয়ে রাখলে মুখের ব্যায়াম হয়, পেশি শিথিল হয়। তবে এই পদ্ধতি তোতলামি কমাতে কোনো কাজ করে না। আরও এতে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

সমাধান

•  দ্রুত কথা বলার সমস্যা হলে ধীরে ধীরে বলার চেষ্টা করতে হবে।

•  কোনো কথা বলার আগে লম্বা শ্বাস নিয়ে নিন। দরকার হলে তিন সেকেন্ড করে বিরতি নিয়ে কথা বলুন।

•  কি কি কথা বলতে হবে, তা আগেই রেডি করে নিন, তাহলে আর ভয় কাজ করবে না। বা এক কথার মাঝে অন্য কথা হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না।

•  কোনো কথা বলা শুরু করলে, চেষ্টা করবেন কথার মাঝে কোনো বিরতি না দিতে। কারণ কথা বলার গতি পেয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আর কথা আটকাবে না।

•  কোনো শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হলে,তা বারবার বলার অভ্যাস করুন। আস্তে আস্তে তা ঠিক হয়ে যাবে।

এছাড়াও কিছু কিছু সাইকোলজিস্ট বলে থাকেন, যদি সবসময় হেসে হেসে কথা বলার অভ্যাস করা যায়, তবে আর কথা আটকানোর ভয় থাকে না। অন্যের সাথেও হাসিখুশি থাকুন। যেকোনো সমস্যা বা কথা বলতে সমস্যা হলে কথা বলার আগে কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করে নিন। এছাড়া মেডিটেশনও করতে পারেন।

লেখক : আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

মানসিক সুস্থতায় কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি

শিবলু কিছুদিন যাবৎ প্যানিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। তাই তিনি একজন সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হন। সাইকোলজিস্ট তাকে তার সমস্যাগুলো শুনে সেই মোতাবেক কিছু ট্রিটমেন্ট সাজেস্ট করেন। ট্রিটমেন্ট গুলোর মধ্যে Cognitive Behavioral Therapy-ও ছিল।

আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসায় সাইকোলজিস্টরা এই Cognitive Behavioral Therapy বা CBT’র কথা বলে থাকেন। কিন্তু এর মানে কী তা অনেকেই জানি না।

Cognitive Behaviour Therapy কী?

মনোরোগের চিকিৎসায় বহুল জনপ্রিয় এবং প্রচলিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হল কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি। এটি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে বিভিন্ন ধরনের, নেতিবাচক, আবেগ ও আচরণগত সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। হতাশা বা দুশ্চিন্তার মত মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সিবিটি ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

Cognitive Behaviour Therapy (CBT) is a type of Psychotherapy which has become a crucial part of Psychology. While it was originally formulated as a treatment for depression, it is now involved in the treatment of many different disorders. [from Wikipedia]

সিবিটি”র সাহায্যে একজন ব্যক্তির অসংলগ্ন চিন্তা ধারাকে বোঝা সম্ভব। এই সময় চিকিৎসক ব্যক্তিকে বিভিন্ন গঠনমূলক কাজ শিখতে সাহায্য করেন, যা পরবর্তীকালে যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই চিকিৎসার লাভ দীর্ঘস্থায়ী এবং এখানে শেখা জিনিস জীবনের যে কোনও স্তরে কাজে লাগানো যেতে পারে।

সিবিটি’র ব্যবহার

মানসিক সমস্যা যেমন ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, ইটিং ডিসঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসঅর্ডার এবং মাদকাসক্তি।

বি.দ্র: বাইপোলার এবং স্কিৎজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে, সিবিটি’র পাশাপাশি ওষুধপত্রও চালিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন অসুস্থতা যেখানে অত্যাধিক যন্ত্রণা, ক্লান্তি, প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম, মস্তিষ্কে আঘাত, ওজন বেড়ে যাওয়া, আতঙ্ক, সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার।
• অত্যাধিক রাগ, দুশ্চিন্তা, জুয়ার নেশা, ইত্যাদি।
• শিশুদের মধ্যে হতাশা বা দুশ্চিন্তা বা অন্যান্য আচরণগত সমস্যা।
• মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হীনমন্যতা, নিদ্রা বিকার, প্রিয়জনকে হারানোর শোক, বার্ধ্যক্যজনিত সমস্যা।

সুবিধা

এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসক কথা বলার মাধ্যমে ব্যক্তিকে জ্ঞ্যান, আচরণ, ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখান। এর ফলে তাঁরা জীবনে যাবতীয় সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে নিতে শেখেন।

নিয়মাবলী

✓ ব্যক্তি মন খুলে সমস্ত কথা জানাতে পারেন।

✓ সিবিটি অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গেও চালিয়ে যাওয়া যায়।

✓ ব্যক্তির সক্রিয় যোগদানের ফলে চিকিৎসা থেমে যাওয়ার ভয় থাকে না।

ব্যক্তির মানসিকতার উপরে নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতিতে সহজেই অদল-বদল করা যায়।

লক্ষ্যপূরণ

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি একটি সক্রিয় এবং লক্ষ্য নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে ব্যক্তি নিম্নলিখিত জিনিসগুলোতে দক্ষ হয়ে উঠেন।

✓ নিজের ভাবাবেগ বুঝে সুস্থ এবং অসুস্থ মানসিকতাকে আলাদা করতে শেখা।

✓ অসংলগ্ন চিন্তার ফলে মানসিক যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় তা বোঝা।

✓ অসুস্থ চিন্তাকে কাটিয়ে সুস্থ এবং গঠনমূলক চিন্তা আনার পদ্ধতি শেখা।

✓ ছোটখাট সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখা।

✓ যে সমস্ত বিশ্বাসের কারণে যাবতীয় সমস্যার উৎপত্তি তাকে কাটিয়ে ওঠা।

কার্যপদ্ধতি

✨ সিবিটি’র মূল উদ্দেশ্যই হল অসংলগ্ন চিন্তাকে সরিয়ে সংলগ্ন চিন্তাকে আনা।

✨ চিকিৎসক প্রথমে ব্যক্তির মানসিকতা, বিশ্বাস, এবং অস্বাভাবিক চিন্তাগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন; যা থেকে তাঁর মনে নিজের এবং চারপাশ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা জন্মাচ্ছে। তারপর সেগুলির কারণ বোঝার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ একজন হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যে কিভাবে তিনি শুধু নেতিবাচক দিকটাই বারবার দেখছেন, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ভাবছেন, নিজের দোষ দেখছেন, ইত্যাদি।

কৌশলসমূহ

✨ প্রথমেই থেরাপিস্ট রোগীকে এসেসমেন্ট করে তাঁর চিকিৎসার ইতিহাস ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেন। এর ফলে তিনি রোগীর সমস্যার ব্যাপারেও বিস্তারিত ভাবে জেনে নেন।

✨ এর পরে চিকিৎসক রোগীকে সিবিটি সম্পর্কে সব কিছু বুঝিয়ে বলেন। কি কি ক্রিয়াকলাপে তাঁকে যুক্ত করা যেতে পারে এবং তাতে রোগীর কিভাবে লাভ হবে তা বলা হয়।

✨ তারপর চিকিৎসক রোগীকে সিবিটি’র মেয়াদ, পরের সেশনের সময়, রোগীর ভূমিকা ইত্যাদি বুঝিয়ে বলেন।

✨ তারপরে চিকিৎসক রোগীকে তাঁর উপসর্গের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলেন (উদাহরণ: অ্যাংজাইটির সাথে হার্ট অ্যাটাকের পার্থক্য, রোগের উপসর্গ সম্পর্কে বোঝা)

✨ চিকিৎসক সিবিটি চলাকালীন রোগীর লক্ষ্যগুলিকে ঠিক করে নেন।

✨ সব মিটে যাওয়ার পরে চিকিৎসক রোগীর নেতিবাচক চিন্তার মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

✨ চিকিৎসক ও রোগী দু’জনে একত্রে চিন্তাভাবনা করে সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করেন। ব্যক্তি সমাধানের রাস্তাগুলি একবার এসেসমেন্ট করে দেখে নিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ: যদি ব্যক্তি অত্যন্ত রাগী হন, তাহলে প্রথমে তাঁর রাগের কারণ জানতে হবে। কি রকম পরিস্থিতিতে তিনি রেগে যান। তারপরে তাঁকে ঠাণ্ডা মাথা যুক্তি সঙ্গত উপায়ে শান্ত থাকতে শেখানো হবে।

চিকিৎসাকালীন কার্যকলাপ

✨ থেরাপি চলাকালীন ব্যক্তিকে নিজের নেতিবাচক মনোভাব চিনতে শেখানো হয়।

✨ তাঁদের চিন্তাধারায় বদল এনে, গঠনমূলক এবং যুক্তিবাদী হতে শেখানো হয়।

✨ মানসিক উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানো হয়।

✨ নেতিবাচক কোনও চিন্তা এলে ব্যক্তিকে সেই ব্যাপারে একটি ডাইরিতে লিখে রাখতে বলা হয়।

✨ তাঁদেরকে বাড়িতে বিভিন্ন চালচলন ও কাজকর্মের অভ্যাস করতে দেওয়া হয়।

✨ চিকিৎসক নিয়মিত রোগীর এসেসমেন্ট করে তাঁর মানসিক উন্নতি সম্পর্কে সুনিশ্চিত হন।

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি কারা দিতে পারেন

বাংলাদেশে প্রফেশনাল কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি দিয়ে থাকেন শুধুমাত্র চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা । একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট যেমন সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, বা একজন সমাজসেবী যিনি কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তিনি এই চিকিৎসা করতে পারেন; কিন্তু তাঁকে কোড অফ এথিকস মেনে চলতে হয়।

সময়কাল

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি একটি স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি। সমস্যার উপরে নির্ভর করে এই চিকিৎসা পদ্ধতি ৫-২০ সপ্তাহ চলতে পারে। ব্যক্তির চিকিৎসায় যতটা সক্রিয়তা দেখাবেন তত জলদি তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তবে সিবিটি’র মূল বিষয় হলো Maladaptive চিন্তাগুলো নিয়ে কাজ করে আচরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

লেখক : আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

মনের যেসব অসুখে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে!

শরীরের ভিতরে-বাইরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যেমন অসুখ হয়। তেমনিভাবে মনেরও অসুখ হয়। আর এ অসুখ মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি অসুখী করে তুলতে পারে।

কিছু কিছু পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজন ‘নিউরোসিস’ বা হাল্কা মাত্রার মানসিক রোগ এবং প্রতি ১০০ জনে একজন ‘সাইকোসিস’ বা বড় মাপের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। আর মানসিক গুণ হিসেবে এ রোগের অস্তিত্ব যেকোনো সচেতন মানুষের মনে ধরা দেয়। তবে কোন অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে সে বিষয়গুলো জানা থাকা জরুরি।

সিজোফ্রেনিয়া

জটিল এবং ভীষন কষ্টদায়ক মানসিক রোগ। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় ২০-৪০ বছর বয়সের যে কোনো সময়ে।

রোগের লক্ষণ:

• রোগী অহেতুক সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে যা পরিবারের নজরে সবার আগে আসে। এমন রোগীর মনে করে যে কেউ তাকে খেয়াল করছে, কেউ চুপি চুপি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বা কেউ তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। রোগী একপর্যায়ে ঘর ছেড়ে বাইর বের হয় না। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাই এ জাতীয় কোনো লক্ষণ মনে আসলে বা কোরো মাঝে দেখা দিলে অবশ্যই সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে।

• এসব রোগীর মাঝে নানা ধরনের অসংলগ্ন আচরণ দেখা যায়। যেমন, অপরিচ্ছন্ন ভাবে চলাফেরা করা। তাড়া না দিলে গোসল না করা, একই জামা কাপড়ে সপ্তাহ পার করে দেয়া এমনকি তা ছিঁড়ে না যাওয়া পর্যন্ত পড়ে থাকা। রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে পাওয়া কাগজ যত্ন সহকারে জমা রাখা, কেউ কেউ আবার হাতের রেখা বা তাবিজ কবজ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

• ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনে কোনো পরিশ্রমী মানুষ হঠাৎ করে অলস হয়ে পড়ে, উদ্দেশ্যহীনভাবে চলাফেরা শুরু করে। আর এসব সিজোফ্রেনিয়া রোগের লক্ষণ। এসব লক্ষণ কারো মাঝে দেখা দিলে বুঝতে হবে তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মরবিড জেলাসী বা অথেলো সিনড্রোম

এটা হচ্ছে সন্দেহ বা বদ্ধমূল বিশ্বাস। পর পুরুষে আসক্ত ভেবে তারা স্ত্রীদের কঠোর অনুশাসনে রাখেন, মারধর ও গালিগালাজ করেন। বাহিরে গেলে স্ত্রীকে চোখে চোখে রাখেন। স্ত্রী শিক্ষিত হলে তার চাকরিতে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

লক্ষণ:

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মনের মাঝে নানা কুচিন্তা ভর করে। এমন কাউকে নিয়ে অনৈতিক চিন্তা করা হচ্ছে যা অত্যন্ত গর্হিত। যা ওই ব্যক্তি বুঝতে পারেন তারপরও বারবার এমন চিন্তা তার মাথায় আসে। ব্রেনের কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের ত্রুটির কারণে মাথায় এমন উদ্ভট কাজ করে।

ওসিডি

বার বার হাত ধোয়া। বার বার গোসল করা। খেতে বসে প্লেট বার বার ধোয়া। শুতে গিয়ে দরজার ছিটকিনি বার বার দেখতে উঠা সবই ওসিডি। চিকিৎসা ছাড়া সেরে উঠা অসম্ভব। দ্রুত মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

মনের মাঝে হতাশা-নিরাশা-আনন্দহীনতা কাজ করে। বন্ধুদের সহচার্য এড়িয়ে চলে একা থাকতে পছন্দ করে। আমাদের চারপাশে প্রতি ১০ জনে এমন একজন খুঁজে পাওয়া যাবে।

লক্ষণ:

মন খারাপ আবার মুর্হূতেই মন ভালো। আবার মুহূর্তেই মন খারাপ। ভয়ঙ্কর মানসিক রোগ। লক্ষণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।

সোমাটাইজেশন

শরীর জ্বালাপোড়া দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা থাকে যা চিকিৎসায় সারে না। আসলে এ লক্ষণ সোমাটাইজেশন বা মানসিক সমস্যার শারীরিক বহির্প্রকাশ। এমতাবস্থায় রোগীর সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।

হিস্টিরিয়া

হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত রোগী নিজের অজান্তে অসুস্থতার ভান করে। যেকোনো ধরনের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান খুঁজতে তারা এমনটা করে। এটা মেয়েদের বেলাতেই বেশি দেখা যায়। সাইকোথেরাপির সাহায্যে সম্পূর্ণ মুক্তি সম্ভব।

উপরোক্ত মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে Cognitive Behavioral Therapy, আবার কিছু ক্ষেত্রে Psychotherapy-র প্রয়োজন, যা মনোচিকিৎসক সমস্যার উপর ভিত্তি করে দিয়ে থাকেন।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

ঘুম যখন রোগ এবং রোগের কারণ

সোহান ইদানিং সারাদিন শুধু ঘুমাচ্ছে। মায়ের বকুনিতে যদিও কিছু সময়ের জন্য উঠে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেই আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে ডিপার্টমেন্টের, এই ঘুমের ঘোরে থাকার জন্য ঠিক মতো ক্লাসও করতে পারছে না। আবার ঘুম থেকে উঠলেও তার খুবই ক্লান্ত লাগে, কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে থাকে মাথা। তার এসব লক্ষণ গুলো হলো “হাইপারসোমনিয়ার” লক্ষণ।

আসলে হাইপারসোমনিয়া কি?

হাইপারসোমনিয়া হল দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাধি, যেখানে একজন হয়তো দীর্ঘক্ষণ ধরে রাতের ঘুম অথবা দিনের বেলা অত্যাধিক ঘুমভাব উপলব্ধি করতে পারেন। যাঁরা অপর্যাপ্ত অথবা অশান্ত ঘুমের কারণে ক্লান্ত বোধ করেন তাঁদের তুলনায় যাঁরা হাইপারসোমনিয়ায় ভোগেন তাঁরা সারারাত ঠিক মতো ঘু্মানো সত্ত্বেও দিনের বেলা লম্বা ঘুম দিতে বাধ্য বোধ করেন।

হাইপারসোমনিয়া প্রায়শই অন্য রোগের সাথে জড়িত আর তা রোগীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।

অতিরিক্ত ঘুমানো কাকে বলে?

বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘুমানোর আদর্শ সময়সীমা ৬-৮ ঘন্টা। এখানে প্রাপ্তবয়স্ক বলতে বোঝানো হয়েছে যাদের বয়স ১৮-৬৪ বছর। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘুমের এই আদর্শ সময়সীমা প্রযোজ্য না। আমরা এখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুম নিয়েই কথা বলব। অর্থাৎ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ঘুম যদি দিনে ৮ ঘন্টার বেশি হয়ে যায়, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। তবে এর মানে এই না যে, আপনি সপ্তাহে কিংবা মাসে একদিন ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে ফেললে সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। আপনি যদি প্রায় প্রতিদিনই ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকেন, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুম বলতে পারেন।

কেন এই রোগটি হয়?

✓ স্লিপ ডিজঅর্ডার নারকোলেপসি বা সারাদিনে অতিমাত্রায় ঘুম হওয়া এবং স্লিপ এপনিয়া বা রাতে ঘুমানোর সময় শ্বাসক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটার কারণে এই রোগ হয়।

✓ স্লিপ ডিপ্রাইভেশণ বা রাতে যথেষ্ট ঘুম না হওয়া।

✓ অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি।

✓ মাদকাসক্ত হওয়া বা অতিরিক্ত অ্যালকোহলের ব্যবহার।

✓ মাথায় আঘাত বা স্নায়ুবিক দুর্বলতা থাকলে।

✓ প্রেসক্রিপশনভুক্ত কিছু ওষুধ যেমন: ট্রানকুইলাইজারস বা অ্যান্টিহিস্টামিনস নিয়মিত খেলে।

✓ জিনগত সমস্যা বা মা-বাবার হাইপারসোমনিয়া থাকলে।

✓ অনেক সময় বিষন্নতা থেকেও অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

হাইপারসোমনিয়ার ফলে সৃষ্ট কিছু রোগ

১. ডায়বেটিকস।
২. স্ট্রোক।
৩. ওজন বৃদ্ধি।
৪. মানসিক ভারসাম্যহীনতা।
৫. হৃদরোগ।
৬. ব্যাথার সৃষ্টি।
৭. অলস মস্তিষ্ক।

লক্ষণ

যাদের এই হাইপারসোমনিয়া আছে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়। যেমন –

* কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা
* শরীরে শক্তি কম থাকা
* স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা থাকা
* দুশ্চিন্তা করা
* দীর্ঘ দিন ধরে বিষণ্ণতায় থাকা

এগুলো নিদ্রাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের অতিরিক্ত ঘুমাতে বাধ্য করে। এছাড়াও ঘুমের মধ্যে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়, যা অনেক সময় অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদা তৈরি করে।

তবে সাময়িক অসুস্থতার জন্য কখনো কখনো কারো ঘুম অনেক বেশি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শরীর সুস্থ হবার পাশাপাশি এই অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদাও দূর হয়ে যায়। এছাড়া মাদকজাত দ্রব্য সেবন করলে কিংবা হীনম্মন্যতায় ভুগলেও অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস দেখা যায়।

অতিরিক্ত ঘুম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?

আমরা যারা নিজেদের এবং আশেপাশের লোকজনের এই অতিরিক্ত ঘুমানো নিয়ে বিরক্ত, তারা প্রায় সবাই এর থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে থাকি। এ ব্যাপারে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মতামত খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সাইকোলজিস্টদের বক্তব্য অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য এবং সাহায্য করতে পারে এমন কয়েকটি উপায় বর্ণনা করা হলো।

✓ আপনার কখন ঘুম থেকে ওঠা জরুরি তার উপর ভিত্তি করে ১-২টি অ্যালার্ম ঠিক করে রাখুন। প্রতিদিন একই সময় ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।

✓ অ্যালার্ম ঘড়িটি হাতের থেকে দূরে রাখুন। এতে অ্যালার্ম বন্ধ করার জন্য হলেও আপনাকে বিছানা ছেড়ে ওঠা লাগবে।

✓ যখন অ্যালার্ম বাজবে তখনই উঠে পড়বেন। ৫ মিনিট বেশি ঘুমানোর জন্য আপনার ১ ঘন্টার দেরি হয়ে যেতেই পারে!

✓ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা অনেকেই নাস্তা করতে চাই না। কিন্তু বলা হয়, যদি আপনি ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে সকালের নাস্তা সেরে ফেলেন, তাহলে আপনি সারাদিনের জন্য কিছু বাড়তি শক্তি পাবেন এবং এটি আপনাকে রাতে ভালো মতো ঘুমাতেও সাহায্য করবে।

✓ রাতে ১-২ ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন শুয়ে পড়বার চেষ্টা করবেন।

✓ সাধারণত সপ্তাহের বন্ধের দিন আমরা একটু বেশি ঘুমাই। এই অভ্যাসটি না করাই ভালো। এটি আপনার নিয়মিত ঘুমের ধারায় ব্যাঘাত আনতে পারে।

✓ নিয়মিত ব্যায়াম করুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এটি আপনার শরীর ও মন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।

✓ সকালের সূর্য দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

✓ কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা বা হীনম্মন্যতার মধ্যে থাকলে তার আসল কারণ খুঁজে বের করুন। এটি কীভাবে সমাধান করা যায় তা আগে ঠিক করুন। কারণ দুশ্চিন্তা আর হীনম্মন্যতা আপনাকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেবে না।

যাদের এই সমস্যা হচ্ছে উপরোক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করলে হাইপারসোমনিয়া থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

আপনার সঙ্গীর কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড?

‘আমার প্রেমিকা সবসময় আমার মুখ থেকে শুনতে চাইতো “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, “I LOVE YOU”, আমি তোমাকে অনেক মিস করি, I MISS YOU, জান, সোনা, লক্ষী, বাবু, এই ধরনের ভালবাসাময় শব্দগুলো, কিন্তু আমার এই শব্দগুলো বলতে মোটেও ভালো লাগতো না, আমার জীবনে হাতেগোনা দুইবার কি তিনবার এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছি, তাও সে রাগ করবে বলে বলেছি, কিন্তু যখন এই শব্দগুলো বলতাম, সে খুব খুশি হতো, আমি বিষয়টি লক্ষ করলাম, সে আমার মুখ থেকে ভালবাসাময় শব্দগুলো শুনতে খুব পছন্দ করতো, কিন্তু আমি এই ধরনের প্রেমময় শব্দগুলো ব্যবহার করি না বলে তার সাথে প্রায় সময় ঝগড়া লাগতো, রাগারাগি হতো, তাও আমি বলতাম না, কারণ আমার ভালো লাগতো না, এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে, সে প্রায় সময় আমাকে বলতো আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি, তোমাকে অনেক মিস করি, তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না, জান, বাবু, লক্ষী, এমন হাজারো প্রেমময় শব্দ, কিন্তু এই ধরনের শব্দ শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগতো না।

আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি ভালবাসতাম না বলে বলতাম না, এবং শুনতেও ভালো লাগতো না, আমার প্রেমিকাও সেইম কথাই বলতো, ভালবাসলে ঠিকই বলতা, ভালবাসনা বলেই বলনা, আমার কাছে বিষয়টি মোটেও এমন নয়, আমার মনে হতো আমি তার চেয়েও বেশি ভালবাসতাম। কিন্তু সে যেমন ভালবাসাময় শব্দগুলো শুনতে ও বলতে পছন্দ করতো , আমি তেমনি ভালবাসাকে অনুভব ও স্পর্শ করতে পছন্দ করতাম। ব্যক্তি টু ব্যক্তি ভালবাসার প্রকাশভঙ্গী ভিন্ন হয়।

আমার কাছে মনে হতো “ভালবাসি” বলার কিছু নাই, ভালবাসি অনুভব করার বিষয়, আমি যখন মাঝে মাঝে দেখতাম আমার প্রতি তার অনুভূতি আছে, টান আছে, একটা পাগলামি আছে, আমার খুব ভালো লাগতো, আমি যখন দেখতাম, সে পরম মমতায় আমার হাতটা স্পর্শ করছে, তখন আমার কাছে ভালবাসা অনুভব হতো, যখন আমার মাথায় হাত রেখে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিতো, তখন আমার কাছে ভালবাসা অনুভব হতো, সে যখন মাঝে মাঝে আমার ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমাতো , তখন আমার অনুভব হতো সে আমাকে অনেক ভালবাসে, আমাকে মুখে না বললেও আমি অনুভব করতে পারতাম, আমি যখন তার প্রতি ভালবাসা অনুভব করতাম, খুব মায়া কাজ করতো, টান কাজ করতো, পাশে থাকলে হাতটা ধরতাম, তার হাতের স্পর্শ অনুভব করতাম, ঘাড়ে মাথা রেখে চুপ করে তাকে অনুভব করতাম, মুখে কিছুই বলতাম না, আমি ভীষণ শান্তি অনুভব করতাম তার মাঝে, অনুভূতি এবং স্পর্শে মাধ্যমে আমার ভালবাসা প্রকাশ করতে পছন্দ করতাম।

আমার প্রেমিকা ভালবাসার কথা শুনতে এবং বলতে পছন্দ করতো, আমি ভালবাসা অনুভব করতে এবং স্পর্শ করতে পছন্দ করতাম, দুইটা বিষয়ই সুন্দর কিন্তু ভিন্ন।

দুই জনের ভিন্ন রকম পছন্দের কারণে আমাদের প্রায় সময় ঝগড়া লেগেই থাকতো, কারণ আমরা কেউই সচেতন ছিলাম না, কারো ভাল লাগার বিষয়ে, কারণ আমরা কেউই জানতাম না, কে কেমন র্পাসোনালিটির, এবং আমি কেমন পার্সোনালিটির, সে কেমন পার্সোনালিটির, তার কোন অনুভূতি বেশি পছন্দ, আমি জানতাম না, যদি জানতাম আমাদের রিলেশনশিপ নিয়ে এতোটা তিক্ততা আসতো না, এতো সমস্যা হতো না, দুইজন দুইজনকে এতো ভালবাসার পরেও। কেউই কাউকে প্রাধান্য দিতে পারিনি, কারণ আমরা জানতাম না, কে কী পছন্দ করে। দুইজনই হয়তো নিজেকে সঠিক ভেবেছিলাম, এবং অন্যকে ভুল ভেবেছিলাম।’

আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব র্পাসোনালিটির গঠন আছে, মানে আমরা একজন অন্য জন থেকে ভিন্ন, কেউ কার মতো না, সবার আলাদা ভালো লাগা, খারাপ লাগা আছে, এই ভাল লাগা, খারাপ লাগা অনুভব করি আমাদের পাঁচটা সেন্সের মাধ্যমে, বা পঞ্চন্দ্রীয়ের মাধ্যমে।

আমাদের পঞ্চন্দ্রীয়গুলো হলো, মুখ, কান, নাক, চোখ, এবং স্কিন। আমাদের সবারই কম বেশি একটি বা দুইটি ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে, অন্য ইন্দ্র‍য়ের তুলনায়, যেমন আমার প্রেমিকার শুনতে বেশি ভাল লাগতো, তার মানে তার কান ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, কারণ সে কান দিয়ে শুনে। আমার ক্ষেত্রে, আমার কাইনেস্থেটিক, বা স্পর্শ করতে বেশি ভাল লাগতো, তার মানে আমার স্কিন ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী।

অনেকের আবার স্মেল বা নাক ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী হতে পারে, এমন র্পাসোনালিটির ব্যক্তিগন কোন একটা খাবার দেখলে প্রথমে দেখে খাবারের স্মেল কেমন, মানে তারা অবচেতন মনে খাবারের স্মেলের দিকে বেশি মনযোগ দিয়ে থাকে, তার কাছে হয়তো খাবার দেখতে কেমন তার থেকেও বেশি প্রাধান্য পাবে স্মেল কেমন, আবার যার ভিজুয়াল বা চোখ ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, সে হয়তো দেখবে খাবারটা দেখতে কেমন, তার কাছে স্মেল থেকেও বেশি প্রাধান্য পাবে ভিজুয়াল পিকচারটা, মানে দেখতে কতোটা সুন্দর। আবার যার স্বাদ বা মুখ ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, তিনি হয়তো খাবারটি দেখতে কেমন, কেমন স্মেল, তার থেকেও বেশি প্রাধান্য দিবেন খাবারটি কতটা মজাদার বা সুস্বাদু।

আপনি যখন আপনার নিজের ইন্দ্রীয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন, আপনার কোন ইন্দ্রীয়টি দ্বারা আপনার আচরণ বেশি প্রভাবিত ,কোন ইন্দ্রীয়কে আপনি বেশি প্রাধান্য দেন, এবং আপনার কাছের মানুষ কোন ইন্দ্রীয় দ্বারা বেশি প্রভাবিত, কোন ইন্দ্রীয় দ্বারা উনি আপনার সাথে আচরণ করে, যখন আপনি উনার পছন্দ সম্পর্কে ভালভাবে বুঝতে পারবেন, তখন আপনার কাছের মানুষের সাথে সম্পর্কের বোঝাপড়া আগের তুলনায় অনেক ভালো হতে পারে।

আপনি এই মুহূর্তে কিছু সময় ভাবতে পারেন, আপনার আচরনে কোন ইন্দ্রীয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, আপনার কাছের মানুষের আচরনে কোন ইন্দ্রীয়ের প্রভাব বেশি, তখন সম্পর্কের বোঝাপড়া অনেক ভালো হতে পারে, মনে করেন আপনার আপনজন শুনতে খুব পছন্দ করে, আপনি তাকে খুশি করতে চাইছেন, আপনি যদি জানেন তার শোনার বা কান ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী তাহলে আপনি তাকে কিছু মিষ্টি কথা বললেই সে খুশি হতে পারে।

আবার মনে করেন, আপনার কাছের মানুষের স্পর্শ বা কাইনেস্থেটিক বেশি পছন্দ, তাহলে সে স্পর্শ বা হাগ পছন্দ করবে, আপনি তাকে খুশি করতে চাইলে হাগ করতে পারেন।

আবার মনে করেন আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা ভিজুয়ালাইজ করতে বেশি পছন্দ করে, আপনি তার সাথে ভিডিও কল করে কথা বলতে পারেন, বা তার সমানে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।

সেই জন্য প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড, এবং তার কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড।।

মহিউদ্দীন মাহী
কাউন্সেলর, আইসিডিডিআর,বি
কাউন্সেলর, ডিইউওএস

মন খারাপ মানেই ডিপ্রেশন নয়

প্র: হঠাৎ হঠাৎ মন বেজায় খারাপ হয়ে যায়। ডিপ্রেশনে চলে যাই। কী করি বলুন তো?

উ: মন খারাপ তো হতেই পারে। কিন্তু সেটা মানেই ডিপ্রেশন নয়।

প্র: আরে খুব হতাশ লাগে যে। কিচ্ছু ভাল লাগে না তখন…

উ: কাজকর্ম করতে পারেন?

প্র: সে তো করতেই হবে। কিন্তু মন বিষণ্ণ হয়েই থাকে।

উ: অফিসে বা পরিবারে কোনও সমস্যার জন্য এক-আধ দিন মন বিক্ষিপ্ত বা বিষণ্ণ হতেই পারে। সঙ্গী বিচ্ছেদ হলে বা প্রিয়জনকে হারালে যেমন বেশ কিছু দিন মন খারাপ থাকে। নিজে নিজে ভাল হয়ে যায়। এ রকম মন খারাপ ডিপ্রেশন নয়।

প্র: তবে ডিপ্রেশন কখন?

উ: মন খারাপ যদি একটানা বহু দিন চলতে থাকে, সঙ্গে কাজের ইচ্ছে, ঘুম বা খিদের ইচ্ছে চলে যায় বা কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে না করে, তবে সেটা ডিপ্রেশন। নিজেকে গুটিয়ে নেন অনেকে। কারও কারও এর সঙ্গে মাথা-গা-হাত-পা ব্যথা হতে পারে। সব সময় নিজেকে ছোট করে দেখা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে। নেগেটিভ চিন্তা গ্রাস করতে করতে অনেকের মৃত্যু চিন্তাও আসে।

প্র: এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার।

উ: এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে। কাউন্সেলিং দরকার। প্রয়োজনে ওষুধ।

প্র: আর এই যে যখন তখন মন খারাপ, তার থেকে রেহাই মিলবে কী করে?

উ: আপনাআপনিই কমে যাবে। কোনও ওষুধ লাগবে না। শুধু মন খারাপকে প্রশ্রয় দেবেন না।

প্র: মন তো কেউ এমনি এমনি খারাপ করে না…

উ: দেখুন একটা প্রবাদ চালু আছে। প্রথমবার ডিপ্রেশন হয় প্রিয়জনের মৃত্যুর পর। তার পর ডিপ্রেশন হয় পোষ্য মারা গেলে। তার পর ডিপ্রেশন হয় রুমাল হারালে! আর তার পর থেকে মন খারাপ হতে থাকে এমনি এমনি। এর আর কোনও কারণই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই যে কারণেই মন খারাপ হোক না কেন, প্রশ্রয় দেবেন না। বরং কাজের মধ্যে ডুবে থাকবেন। দেখবেন মন খারাপ হচ্ছে না।

প্র: কিন্তু কাজ মিটলে তো আবার যে কে সেই?

উ: তখন যেটা ভাল লাগে, সেটা করুন। গান শুনুন। বই পড়ুন। বাগানে সময় কাটান। কাউকে ফোন করুন, চ্যাট করুন। অন্য কিছুতে মনকে ব্যস্ত করে ফেলতে হবে।

প্র: মেঘলা দিনেও তো মন খারাপ হয়ে যায়।

উ: আসলে সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি ব্রেনের ফিল গুড কেমিক্যালগুলোকে উজ্জীবিত করে। তাই রোদ না উঠলে মন খারাপ হয়। সে ক্ষেত্রেও একই টোটকা। মনকে ব্যস্ত রাখুন।

প্র: ধরুন অফিসে ব্যাপক ঝামেলা চলছে। তখন?

উ: ঝামেলা যা-ই হোক না কেন, ব্যাপারটা আপনি কী ভাবে নিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে। ধরুন একটা লোক আপনাকে দেখে হাসল, আপনি ভাবতে পারেন আপনাকে টিটকিরি মারল। আবার কেউ ভাবতে পারে লোকটা হয়তো তাঁর পরিচিত…। আপনি কী ভাবে ব্যাপারটাকে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করবে। আর অফিসের যে কোনও ঝামেলার মূলে থাকে উচ্চাশা। কোনও ব্যাপারে সাফল্য না মিললেই মনে হয় সব শেষ। উচ্চাশা নিয়ন্ত্রণে রাখলে মন খারাপ কম হবে।

প্র: তাই বলে উচ্চাশা থাকবে না?

উ: অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেটা না পেলেই সব শেষ তেমনটা যেন না হয়। প্রথমেই ধরতে হবে ব্যাপারটা সাময়িক। এক বার সাফল্য না পেলে যে বার বার তেমনটাই হতে থাকবে তা নয়। নিজেকে বোঝাবেন, আমি এই ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নেব না। আজ হয়নি কাল হবে। যেটুকু পাচ্ছি, সেটাতেই বরং পুরোপুরি মন দিই। ব্যাপারটাকে স্পোর্টিংলি নিতে হবে। এই ভাবে নিজেকে মোটিভেট করতে হবে।

প্র: এগুলো বলতেই সোজা। সমস্যা যখন আসে, তখন…

উ: এক জন কী ভাবে বেড়ে উঠেছে, তার ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে।

প্র: বুঝলাম না…

উ: দেখবেন কিছু বাচ্চা অশান্তির পরিবেশে বড় হয়। সারা দিন হয়তো বাবা-মা ঝগড়া করছে। তাতে বাচ্চাটি ইনসিকিয়োরিটিতে ভোগে। সেটা বড় হয়েও থেকে যায়। আবার অনেক মা’কে বলতে শুনবেন, আমার ছেলে কিচ্ছু লুকোয় না, আমায় সব কথা বলে। ১৭ বছরের ছেলে মায়ের সঙ্গে ঘুমোচ্ছে। বা কলেজে মেয়ে পড়তে যাচ্ছে, মা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে। এ ভাবে বড় হলে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে, এদের স্ট্রেস বেশি হয়। চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কম হয় আর ডিপ্রেশন হয়।

প্র: ধরুন কেউ এ ভাবে বড় হয়েছে। সে চাপ সামলাবে কী করে?

উ: স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা অল্প অল্প করে বাড়াতে হবে। ধরুন কেউ অফিস নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে কোনও কাজ করেন না। সে ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ একটু করতে হবে। প্রয়োজনে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। দরকার মতো ‘না’ বলতে শিখতে হবে। নিয়মিত প্রাণায়াম করলেও স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে। ডায়রি লিখুন। তাতে মনের গ্লানিগুলো পাতায় লিখে ফেললে স্ট্রেস কমে। লাইফ স্টাইল মডিফিকেশন করলেও স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে।

প্র: তাহলে মন খারাপও মিটবে?

উ: অনেকটা। আসলে মনের মধ্যে সন্তুষ্টি ব্যাপারটা থাকলে কখনই অসুখী হবেন না। কিন্তু যেটুকু হ্যাপিনেস আছে, সেটাকেই যদি দেখতে না পান, তবে কিন্তু সন্তুষ্টি কিছুতেই আসবে না।

প্র: বয়স্করাও ডিপ্রেশনে ভোগেন

উ: বয়স কালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নানা সমস্যা হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে একাকীত্ব। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখানো দরকার।

প্র: অবসর নেওয়ার পর তো অনেককেই ডিপ্রেশনে ভোগেন…

উ: হ্যা। আসলে ইনকাম কমে গেল, প্রতিপত্তি কমে গেল। তাই মনে করেন ফালতু হয়ে গেলাম। দেখবেন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলেও মাঝবয়সি মহিলাদের একই সমস্যা হয়। এটা মিডল এজ ক্রাইসিস। সে ক্ষেত্রে আগে ভাগেই রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান তৈরি করতে হবে। নিজস্ব ভাল লাগা তৈরি করতে হবে। পুরনো ভাল লাগাগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ভাবে ভাবতে হবে যে, এত দিন বন্ধন ছিল, তাই কিছু করতে পারিনি। এ বার পেনডিং কাজ করব।

লেখকঃ ডা. অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা