মানসিক সুস্থতায় কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি

শিবলু কিছুদিন যাবৎ প্যানিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। তাই তিনি একজন সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হন। সাইকোলজিস্ট তাকে তার সমস্যাগুলো শুনে সেই মোতাবেক কিছু ট্রিটমেন্ট সাজেস্ট করেন। ট্রিটমেন্ট গুলোর মধ্যে Cognitive Behavioral Therapy-ও ছিল।

আমরা প্রায়ই দেখে থাকি, বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসায় সাইকোলজিস্টরা এই Cognitive Behavioral Therapy বা CBT’র কথা বলে থাকেন। কিন্তু এর মানে কী তা অনেকেই জানি না।

Cognitive Behaviour Therapy কী?

মনোরোগের চিকিৎসায় বহুল জনপ্রিয় এবং প্রচলিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হল কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি। এটি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে বিভিন্ন ধরনের, নেতিবাচক, আবেগ ও আচরণগত সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। হতাশা বা দুশ্চিন্তার মত মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় সিবিটি ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

Cognitive Behaviour Therapy (CBT) is a type of Psychotherapy which has become a crucial part of Psychology. While it was originally formulated as a treatment for depression, it is now involved in the treatment of many different disorders. [from Wikipedia]

সিবিটি”র সাহায্যে একজন ব্যক্তির অসংলগ্ন চিন্তা ধারাকে বোঝা সম্ভব। এই সময় চিকিৎসক ব্যক্তিকে বিভিন্ন গঠনমূলক কাজ শিখতে সাহায্য করেন, যা পরবর্তীকালে যুক্তিবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই চিকিৎসার লাভ দীর্ঘস্থায়ী এবং এখানে শেখা জিনিস জীবনের যে কোনও স্তরে কাজে লাগানো যেতে পারে।

সিবিটি’র ব্যবহার

মানসিক সমস্যা যেমন ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, ইটিং ডিসঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক ডিসঅর্ডার এবং মাদকাসক্তি।

বি.দ্র: বাইপোলার এবং স্কিৎজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে, সিবিটি’র পাশাপাশি ওষুধপত্রও চালিয়ে যেতে হয়। বিভিন্ন অসুস্থতা যেখানে অত্যাধিক যন্ত্রণা, ক্লান্তি, প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম, মস্তিষ্কে আঘাত, ওজন বেড়ে যাওয়া, আতঙ্ক, সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার।
• অত্যাধিক রাগ, দুশ্চিন্তা, জুয়ার নেশা, ইত্যাদি।
• শিশুদের মধ্যে হতাশা বা দুশ্চিন্তা বা অন্যান্য আচরণগত সমস্যা।
• মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হীনমন্যতা, নিদ্রা বিকার, প্রিয়জনকে হারানোর শোক, বার্ধ্যক্যজনিত সমস্যা।

সুবিধা

এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসক কথা বলার মাধ্যমে ব্যক্তিকে জ্ঞ্যান, আচরণ, ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখান। এর ফলে তাঁরা জীবনে যাবতীয় সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে নিতে শেখেন।

নিয়মাবলী

✓ ব্যক্তি মন খুলে সমস্ত কথা জানাতে পারেন।

✓ সিবিটি অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গেও চালিয়ে যাওয়া যায়।

✓ ব্যক্তির সক্রিয় যোগদানের ফলে চিকিৎসা থেমে যাওয়ার ভয় থাকে না।

ব্যক্তির মানসিকতার উপরে নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতিতে সহজেই অদল-বদল করা যায়।

লক্ষ্যপূরণ

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি একটি সক্রিয় এবং লক্ষ্য নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে ব্যক্তি নিম্নলিখিত জিনিসগুলোতে দক্ষ হয়ে উঠেন।

✓ নিজের ভাবাবেগ বুঝে সুস্থ এবং অসুস্থ মানসিকতাকে আলাদা করতে শেখা।

✓ অসংলগ্ন চিন্তার ফলে মানসিক যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় তা বোঝা।

✓ অসুস্থ চিন্তাকে কাটিয়ে সুস্থ এবং গঠনমূলক চিন্তা আনার পদ্ধতি শেখা।

✓ ছোটখাট সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখা।

✓ যে সমস্ত বিশ্বাসের কারণে যাবতীয় সমস্যার উৎপত্তি তাকে কাটিয়ে ওঠা।

কার্যপদ্ধতি

✨ সিবিটি’র মূল উদ্দেশ্যই হল অসংলগ্ন চিন্তাকে সরিয়ে সংলগ্ন চিন্তাকে আনা।

✨ চিকিৎসক প্রথমে ব্যক্তির মানসিকতা, বিশ্বাস, এবং অস্বাভাবিক চিন্তাগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন; যা থেকে তাঁর মনে নিজের এবং চারপাশ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা জন্মাচ্ছে। তারপর সেগুলির কারণ বোঝার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ একজন হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যে কিভাবে তিনি শুধু নেতিবাচক দিকটাই বারবার দেখছেন, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ভাবছেন, নিজের দোষ দেখছেন, ইত্যাদি।

কৌশলসমূহ

✨ প্রথমেই থেরাপিস্ট রোগীকে এসেসমেন্ট করে তাঁর চিকিৎসার ইতিহাস ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেন। এর ফলে তিনি রোগীর সমস্যার ব্যাপারেও বিস্তারিত ভাবে জেনে নেন।

✨ এর পরে চিকিৎসক রোগীকে সিবিটি সম্পর্কে সব কিছু বুঝিয়ে বলেন। কি কি ক্রিয়াকলাপে তাঁকে যুক্ত করা যেতে পারে এবং তাতে রোগীর কিভাবে লাভ হবে তা বলা হয়।

✨ তারপর চিকিৎসক রোগীকে সিবিটি’র মেয়াদ, পরের সেশনের সময়, রোগীর ভূমিকা ইত্যাদি বুঝিয়ে বলেন।

✨ তারপরে চিকিৎসক রোগীকে তাঁর উপসর্গের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলেন (উদাহরণ: অ্যাংজাইটির সাথে হার্ট অ্যাটাকের পার্থক্য, রোগের উপসর্গ সম্পর্কে বোঝা)

✨ চিকিৎসক সিবিটি চলাকালীন রোগীর লক্ষ্যগুলিকে ঠিক করে নেন।

✨ সব মিটে যাওয়ার পরে চিকিৎসক রোগীর নেতিবাচক চিন্তার মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

✨ চিকিৎসক ও রোগী দু’জনে একত্রে চিন্তাভাবনা করে সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করেন। ব্যক্তি সমাধানের রাস্তাগুলি একবার এসেসমেন্ট করে দেখে নিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ: যদি ব্যক্তি অত্যন্ত রাগী হন, তাহলে প্রথমে তাঁর রাগের কারণ জানতে হবে। কি রকম পরিস্থিতিতে তিনি রেগে যান। তারপরে তাঁকে ঠাণ্ডা মাথা যুক্তি সঙ্গত উপায়ে শান্ত থাকতে শেখানো হবে।

চিকিৎসাকালীন কার্যকলাপ

✨ থেরাপি চলাকালীন ব্যক্তিকে নিজের নেতিবাচক মনোভাব চিনতে শেখানো হয়।

✨ তাঁদের চিন্তাধারায় বদল এনে, গঠনমূলক এবং যুক্তিবাদী হতে শেখানো হয়।

✨ মানসিক উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানো হয়।

✨ নেতিবাচক কোনও চিন্তা এলে ব্যক্তিকে সেই ব্যাপারে একটি ডাইরিতে লিখে রাখতে বলা হয়।

✨ তাঁদেরকে বাড়িতে বিভিন্ন চালচলন ও কাজকর্মের অভ্যাস করতে দেওয়া হয়।

✨ চিকিৎসক নিয়মিত রোগীর এসেসমেন্ট করে তাঁর মানসিক উন্নতি সম্পর্কে সুনিশ্চিত হন।

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি কারা দিতে পারেন

বাংলাদেশে প্রফেশনাল কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি দিয়ে থাকেন শুধুমাত্র চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা । একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট যেমন সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, বা একজন সমাজসেবী যিনি কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তিনি এই চিকিৎসা করতে পারেন; কিন্তু তাঁকে কোড অফ এথিকস মেনে চলতে হয়।

সময়কাল

কগনিটিভ বিহেভিওর থেরাপি একটি স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি। সমস্যার উপরে নির্ভর করে এই চিকিৎসা পদ্ধতি ৫-২০ সপ্তাহ চলতে পারে। ব্যক্তির চিকিৎসায় যতটা সক্রিয়তা দেখাবেন তত জলদি তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তবে সিবিটি’র মূল বিষয় হলো Maladaptive চিন্তাগুলো নিয়ে কাজ করে আচরনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

লেখক : আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

মনের যেসব অসুখে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে!

শরীরের ভিতরে-বাইরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যেমন অসুখ হয়। তেমনিভাবে মনেরও অসুখ হয়। আর এ অসুখ মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি অসুখী করে তুলতে পারে।

কিছু কিছু পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজন ‘নিউরোসিস’ বা হাল্কা মাত্রার মানসিক রোগ এবং প্রতি ১০০ জনে একজন ‘সাইকোসিস’ বা বড় মাপের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। আর মানসিক গুণ হিসেবে এ রোগের অস্তিত্ব যেকোনো সচেতন মানুষের মনে ধরা দেয়। তবে কোন অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে সে বিষয়গুলো জানা থাকা জরুরি।

সিজোফ্রেনিয়া

জটিল এবং ভীষন কষ্টদায়ক মানসিক রোগ। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় ২০-৪০ বছর বয়সের যে কোনো সময়ে।

রোগের লক্ষণ:

• রোগী অহেতুক সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে যা পরিবারের নজরে সবার আগে আসে। এমন রোগীর মনে করে যে কেউ তাকে খেয়াল করছে, কেউ চুপি চুপি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বা কেউ তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। রোগী একপর্যায়ে ঘর ছেড়ে বাইর বের হয় না। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাই এ জাতীয় কোনো লক্ষণ মনে আসলে বা কোরো মাঝে দেখা দিলে অবশ্যই সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে।

• এসব রোগীর মাঝে নানা ধরনের অসংলগ্ন আচরণ দেখা যায়। যেমন, অপরিচ্ছন্ন ভাবে চলাফেরা করা। তাড়া না দিলে গোসল না করা, একই জামা কাপড়ে সপ্তাহ পার করে দেয়া এমনকি তা ছিঁড়ে না যাওয়া পর্যন্ত পড়ে থাকা। রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে পাওয়া কাগজ যত্ন সহকারে জমা রাখা, কেউ কেউ আবার হাতের রেখা বা তাবিজ কবজ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

• ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনে কোনো পরিশ্রমী মানুষ হঠাৎ করে অলস হয়ে পড়ে, উদ্দেশ্যহীনভাবে চলাফেরা শুরু করে। আর এসব সিজোফ্রেনিয়া রোগের লক্ষণ। এসব লক্ষণ কারো মাঝে দেখা দিলে বুঝতে হবে তিনি মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মরবিড জেলাসী বা অথেলো সিনড্রোম

এটা হচ্ছে সন্দেহ বা বদ্ধমূল বিশ্বাস। পর পুরুষে আসক্ত ভেবে তারা স্ত্রীদের কঠোর অনুশাসনে রাখেন, মারধর ও গালিগালাজ করেন। বাহিরে গেলে স্ত্রীকে চোখে চোখে রাখেন। স্ত্রী শিক্ষিত হলে তার চাকরিতে যাওয়া বন্ধ করে দেন।

লক্ষণ:

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মনের মাঝে নানা কুচিন্তা ভর করে। এমন কাউকে নিয়ে অনৈতিক চিন্তা করা হচ্ছে যা অত্যন্ত গর্হিত। যা ওই ব্যক্তি বুঝতে পারেন তারপরও বারবার এমন চিন্তা তার মাথায় আসে। ব্রেনের কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের ত্রুটির কারণে মাথায় এমন উদ্ভট কাজ করে।

ওসিডি

বার বার হাত ধোয়া। বার বার গোসল করা। খেতে বসে প্লেট বার বার ধোয়া। শুতে গিয়ে দরজার ছিটকিনি বার বার দেখতে উঠা সবই ওসিডি। চিকিৎসা ছাড়া সেরে উঠা অসম্ভব। দ্রুত মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

মনের মাঝে হতাশা-নিরাশা-আনন্দহীনতা কাজ করে। বন্ধুদের সহচার্য এড়িয়ে চলে একা থাকতে পছন্দ করে। আমাদের চারপাশে প্রতি ১০ জনে এমন একজন খুঁজে পাওয়া যাবে।

লক্ষণ:

মন খারাপ আবার মুর্হূতেই মন ভালো। আবার মুহূর্তেই মন খারাপ। ভয়ঙ্কর মানসিক রোগ। লক্ষণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।

সোমাটাইজেশন

শরীর জ্বালাপোড়া দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা থাকে যা চিকিৎসায় সারে না। আসলে এ লক্ষণ সোমাটাইজেশন বা মানসিক সমস্যার শারীরিক বহির্প্রকাশ। এমতাবস্থায় রোগীর সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।

হিস্টিরিয়া

হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত রোগী নিজের অজান্তে অসুস্থতার ভান করে। যেকোনো ধরনের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান খুঁজতে তারা এমনটা করে। এটা মেয়েদের বেলাতেই বেশি দেখা যায়। সাইকোথেরাপির সাহায্যে সম্পূর্ণ মুক্তি সম্ভব।

উপরোক্ত মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে Cognitive Behavioral Therapy, আবার কিছু ক্ষেত্রে Psychotherapy-র প্রয়োজন, যা মনোচিকিৎসক সমস্যার উপর ভিত্তি করে দিয়ে থাকেন।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

ঘুম যখন রোগ এবং রোগের কারণ

সোহান ইদানিং সারাদিন শুধু ঘুমাচ্ছে। মায়ের বকুনিতে যদিও কিছু সময়ের জন্য উঠে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেই আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে ডিপার্টমেন্টের, এই ঘুমের ঘোরে থাকার জন্য ঠিক মতো ক্লাসও করতে পারছে না। আবার ঘুম থেকে উঠলেও তার খুবই ক্লান্ত লাগে, কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে থাকে মাথা। তার এসব লক্ষণ গুলো হলো “হাইপারসোমনিয়ার” লক্ষণ।

আসলে হাইপারসোমনিয়া কি?

হাইপারসোমনিয়া হল দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুতন্ত্রের ব্যাধি, যেখানে একজন হয়তো দীর্ঘক্ষণ ধরে রাতের ঘুম অথবা দিনের বেলা অত্যাধিক ঘুমভাব উপলব্ধি করতে পারেন। যাঁরা অপর্যাপ্ত অথবা অশান্ত ঘুমের কারণে ক্লান্ত বোধ করেন তাঁদের তুলনায় যাঁরা হাইপারসোমনিয়ায় ভোগেন তাঁরা সারারাত ঠিক মতো ঘু্মানো সত্ত্বেও দিনের বেলা লম্বা ঘুম দিতে বাধ্য বোধ করেন।

হাইপারসোমনিয়া প্রায়শই অন্য রোগের সাথে জড়িত আর তা রোগীর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।

অতিরিক্ত ঘুমানো কাকে বলে?

বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘুমানোর আদর্শ সময়সীমা ৬-৮ ঘন্টা। এখানে প্রাপ্তবয়স্ক বলতে বোঝানো হয়েছে যাদের বয়স ১৮-৬৪ বছর। অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘুমের এই আদর্শ সময়সীমা প্রযোজ্য না। আমরা এখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুম নিয়েই কথা বলব। অর্থাৎ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ঘুম যদি দিনে ৮ ঘন্টার বেশি হয়ে যায়, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। তবে এর মানে এই না যে, আপনি সপ্তাহে কিংবা মাসে একদিন ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে ফেললে সেটিকে অতিরিক্ত ঘুমানো বলতে হবে। আপনি যদি প্রায় প্রতিদিনই ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকেন, তখন সেটিকে অতিরিক্ত ঘুম বলতে পারেন।

কেন এই রোগটি হয়?

✓ স্লিপ ডিজঅর্ডার নারকোলেপসি বা সারাদিনে অতিমাত্রায় ঘুম হওয়া এবং স্লিপ এপনিয়া বা রাতে ঘুমানোর সময় শ্বাসক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটার কারণে এই রোগ হয়।

✓ স্লিপ ডিপ্রাইভেশণ বা রাতে যথেষ্ট ঘুম না হওয়া।

✓ অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি।

✓ মাদকাসক্ত হওয়া বা অতিরিক্ত অ্যালকোহলের ব্যবহার।

✓ মাথায় আঘাত বা স্নায়ুবিক দুর্বলতা থাকলে।

✓ প্রেসক্রিপশনভুক্ত কিছু ওষুধ যেমন: ট্রানকুইলাইজারস বা অ্যান্টিহিস্টামিনস নিয়মিত খেলে।

✓ জিনগত সমস্যা বা মা-বাবার হাইপারসোমনিয়া থাকলে।

✓ অনেক সময় বিষন্নতা থেকেও অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

হাইপারসোমনিয়ার ফলে সৃষ্ট কিছু রোগ

১. ডায়বেটিকস।
২. স্ট্রোক।
৩. ওজন বৃদ্ধি।
৪. মানসিক ভারসাম্যহীনতা।
৫. হৃদরোগ।
৬. ব্যাথার সৃষ্টি।
৭. অলস মস্তিষ্ক।

লক্ষণ

যাদের এই হাইপারসোমনিয়া আছে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়। যেমন –

* কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা
* শরীরে শক্তি কম থাকা
* স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা থাকা
* দুশ্চিন্তা করা
* দীর্ঘ দিন ধরে বিষণ্ণতায় থাকা

এগুলো নিদ্রাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের অতিরিক্ত ঘুমাতে বাধ্য করে। এছাড়াও ঘুমের মধ্যে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়, যা অনেক সময় অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদা তৈরি করে।

তবে সাময়িক অসুস্থতার জন্য কখনো কখনো কারো ঘুম অনেক বেশি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শরীর সুস্থ হবার পাশাপাশি এই অতিরিক্ত ঘুমানোর চাহিদাও দূর হয়ে যায়। এছাড়া মাদকজাত দ্রব্য সেবন করলে কিংবা হীনম্মন্যতায় ভুগলেও অতিরিক্ত ঘুমানোর অভ্যাস দেখা যায়।

অতিরিক্ত ঘুম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?

আমরা যারা নিজেদের এবং আশেপাশের লোকজনের এই অতিরিক্ত ঘুমানো নিয়ে বিরক্ত, তারা প্রায় সবাই এর থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে থাকি। এ ব্যাপারে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মতামত খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সাইকোলজিস্টদের বক্তব্য অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য এবং সাহায্য করতে পারে এমন কয়েকটি উপায় বর্ণনা করা হলো।

✓ আপনার কখন ঘুম থেকে ওঠা জরুরি তার উপর ভিত্তি করে ১-২টি অ্যালার্ম ঠিক করে রাখুন। প্রতিদিন একই সময় ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।

✓ অ্যালার্ম ঘড়িটি হাতের থেকে দূরে রাখুন। এতে অ্যালার্ম বন্ধ করার জন্য হলেও আপনাকে বিছানা ছেড়ে ওঠা লাগবে।

✓ যখন অ্যালার্ম বাজবে তখনই উঠে পড়বেন। ৫ মিনিট বেশি ঘুমানোর জন্য আপনার ১ ঘন্টার দেরি হয়ে যেতেই পারে!

✓ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা অনেকেই নাস্তা করতে চাই না। কিন্তু বলা হয়, যদি আপনি ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে সকালের নাস্তা সেরে ফেলেন, তাহলে আপনি সারাদিনের জন্য কিছু বাড়তি শক্তি পাবেন এবং এটি আপনাকে রাতে ভালো মতো ঘুমাতেও সাহায্য করবে।

✓ রাতে ১-২ ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন শুয়ে পড়বার চেষ্টা করবেন।

✓ সাধারণত সপ্তাহের বন্ধের দিন আমরা একটু বেশি ঘুমাই। এই অভ্যাসটি না করাই ভালো। এটি আপনার নিয়মিত ঘুমের ধারায় ব্যাঘাত আনতে পারে।

✓ নিয়মিত ব্যায়াম করুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এটি আপনার শরীর ও মন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।

✓ সকালের সূর্য দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

✓ কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা বা হীনম্মন্যতার মধ্যে থাকলে তার আসল কারণ খুঁজে বের করুন। এটি কীভাবে সমাধান করা যায় তা আগে ঠিক করুন। কারণ দুশ্চিন্তা আর হীনম্মন্যতা আপনাকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেবে না।

যাদের এই সমস্যা হচ্ছে উপরোক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করলে হাইপারসোমনিয়া থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

আপনার সঙ্গীর কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড?

‘আমার প্রেমিকা সবসময় আমার মুখ থেকে শুনতে চাইতো “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, “I LOVE YOU”, আমি তোমাকে অনেক মিস করি, I MISS YOU, জান, সোনা, লক্ষী, বাবু, এই ধরনের ভালবাসাময় শব্দগুলো, কিন্তু আমার এই শব্দগুলো বলতে মোটেও ভালো লাগতো না, আমার জীবনে হাতেগোনা দুইবার কি তিনবার এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছি, তাও সে রাগ করবে বলে বলেছি, কিন্তু যখন এই শব্দগুলো বলতাম, সে খুব খুশি হতো, আমি বিষয়টি লক্ষ করলাম, সে আমার মুখ থেকে ভালবাসাময় শব্দগুলো শুনতে খুব পছন্দ করতো, কিন্তু আমি এই ধরনের প্রেমময় শব্দগুলো ব্যবহার করি না বলে তার সাথে প্রায় সময় ঝগড়া লাগতো, রাগারাগি হতো, তাও আমি বলতাম না, কারণ আমার ভালো লাগতো না, এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে, সে প্রায় সময় আমাকে বলতো আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি, তোমাকে অনেক মিস করি, তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না, জান, বাবু, লক্ষী, এমন হাজারো প্রেমময় শব্দ, কিন্তু এই ধরনের শব্দ শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগতো না।

আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি ভালবাসতাম না বলে বলতাম না, এবং শুনতেও ভালো লাগতো না, আমার প্রেমিকাও সেইম কথাই বলতো, ভালবাসলে ঠিকই বলতা, ভালবাসনা বলেই বলনা, আমার কাছে বিষয়টি মোটেও এমন নয়, আমার মনে হতো আমি তার চেয়েও বেশি ভালবাসতাম। কিন্তু সে যেমন ভালবাসাময় শব্দগুলো শুনতে ও বলতে পছন্দ করতো , আমি তেমনি ভালবাসাকে অনুভব ও স্পর্শ করতে পছন্দ করতাম। ব্যক্তি টু ব্যক্তি ভালবাসার প্রকাশভঙ্গী ভিন্ন হয়।

আমার কাছে মনে হতো “ভালবাসি” বলার কিছু নাই, ভালবাসি অনুভব করার বিষয়, আমি যখন মাঝে মাঝে দেখতাম আমার প্রতি তার অনুভূতি আছে, টান আছে, একটা পাগলামি আছে, আমার খুব ভালো লাগতো, আমি যখন দেখতাম, সে পরম মমতায় আমার হাতটা স্পর্শ করছে, তখন আমার কাছে ভালবাসা অনুভব হতো, যখন আমার মাথায় হাত রেখে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিতো, তখন আমার কাছে ভালবাসা অনুভব হতো, সে যখন মাঝে মাঝে আমার ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমাতো , তখন আমার অনুভব হতো সে আমাকে অনেক ভালবাসে, আমাকে মুখে না বললেও আমি অনুভব করতে পারতাম, আমি যখন তার প্রতি ভালবাসা অনুভব করতাম, খুব মায়া কাজ করতো, টান কাজ করতো, পাশে থাকলে হাতটা ধরতাম, তার হাতের স্পর্শ অনুভব করতাম, ঘাড়ে মাথা রেখে চুপ করে তাকে অনুভব করতাম, মুখে কিছুই বলতাম না, আমি ভীষণ শান্তি অনুভব করতাম তার মাঝে, অনুভূতি এবং স্পর্শে মাধ্যমে আমার ভালবাসা প্রকাশ করতে পছন্দ করতাম।

আমার প্রেমিকা ভালবাসার কথা শুনতে এবং বলতে পছন্দ করতো, আমি ভালবাসা অনুভব করতে এবং স্পর্শ করতে পছন্দ করতাম, দুইটা বিষয়ই সুন্দর কিন্তু ভিন্ন।

দুই জনের ভিন্ন রকম পছন্দের কারণে আমাদের প্রায় সময় ঝগড়া লেগেই থাকতো, কারণ আমরা কেউই সচেতন ছিলাম না, কারো ভাল লাগার বিষয়ে, কারণ আমরা কেউই জানতাম না, কে কেমন র্পাসোনালিটির, এবং আমি কেমন পার্সোনালিটির, সে কেমন পার্সোনালিটির, তার কোন অনুভূতি বেশি পছন্দ, আমি জানতাম না, যদি জানতাম আমাদের রিলেশনশিপ নিয়ে এতোটা তিক্ততা আসতো না, এতো সমস্যা হতো না, দুইজন দুইজনকে এতো ভালবাসার পরেও। কেউই কাউকে প্রাধান্য দিতে পারিনি, কারণ আমরা জানতাম না, কে কী পছন্দ করে। দুইজনই হয়তো নিজেকে সঠিক ভেবেছিলাম, এবং অন্যকে ভুল ভেবেছিলাম।’

আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব র্পাসোনালিটির গঠন আছে, মানে আমরা একজন অন্য জন থেকে ভিন্ন, কেউ কার মতো না, সবার আলাদা ভালো লাগা, খারাপ লাগা আছে, এই ভাল লাগা, খারাপ লাগা অনুভব করি আমাদের পাঁচটা সেন্সের মাধ্যমে, বা পঞ্চন্দ্রীয়ের মাধ্যমে।

আমাদের পঞ্চন্দ্রীয়গুলো হলো, মুখ, কান, নাক, চোখ, এবং স্কিন। আমাদের সবারই কম বেশি একটি বা দুইটি ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে, অন্য ইন্দ্র‍য়ের তুলনায়, যেমন আমার প্রেমিকার শুনতে বেশি ভাল লাগতো, তার মানে তার কান ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, কারণ সে কান দিয়ে শুনে। আমার ক্ষেত্রে, আমার কাইনেস্থেটিক, বা স্পর্শ করতে বেশি ভাল লাগতো, তার মানে আমার স্কিন ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী।

অনেকের আবার স্মেল বা নাক ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী হতে পারে, এমন র্পাসোনালিটির ব্যক্তিগন কোন একটা খাবার দেখলে প্রথমে দেখে খাবারের স্মেল কেমন, মানে তারা অবচেতন মনে খাবারের স্মেলের দিকে বেশি মনযোগ দিয়ে থাকে, তার কাছে হয়তো খাবার দেখতে কেমন তার থেকেও বেশি প্রাধান্য পাবে স্মেল কেমন, আবার যার ভিজুয়াল বা চোখ ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, সে হয়তো দেখবে খাবারটা দেখতে কেমন, তার কাছে স্মেল থেকেও বেশি প্রাধান্য পাবে ভিজুয়াল পিকচারটা, মানে দেখতে কতোটা সুন্দর। আবার যার স্বাদ বা মুখ ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী, তিনি হয়তো খাবারটি দেখতে কেমন, কেমন স্মেল, তার থেকেও বেশি প্রাধান্য দিবেন খাবারটি কতটা মজাদার বা সুস্বাদু।

আপনি যখন আপনার নিজের ইন্দ্রীয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন, আপনার কোন ইন্দ্রীয়টি দ্বারা আপনার আচরণ বেশি প্রভাবিত ,কোন ইন্দ্রীয়কে আপনি বেশি প্রাধান্য দেন, এবং আপনার কাছের মানুষ কোন ইন্দ্রীয় দ্বারা বেশি প্রভাবিত, কোন ইন্দ্রীয় দ্বারা উনি আপনার সাথে আচরণ করে, যখন আপনি উনার পছন্দ সম্পর্কে ভালভাবে বুঝতে পারবেন, তখন আপনার কাছের মানুষের সাথে সম্পর্কের বোঝাপড়া আগের তুলনায় অনেক ভালো হতে পারে।

আপনি এই মুহূর্তে কিছু সময় ভাবতে পারেন, আপনার আচরনে কোন ইন্দ্রীয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, আপনার কাছের মানুষের আচরনে কোন ইন্দ্রীয়ের প্রভাব বেশি, তখন সম্পর্কের বোঝাপড়া অনেক ভালো হতে পারে, মনে করেন আপনার আপনজন শুনতে খুব পছন্দ করে, আপনি তাকে খুশি করতে চাইছেন, আপনি যদি জানেন তার শোনার বা কান ইন্দ্রীয় বেশি শক্তিশালী তাহলে আপনি তাকে কিছু মিষ্টি কথা বললেই সে খুশি হতে পারে।

আবার মনে করেন, আপনার কাছের মানুষের স্পর্শ বা কাইনেস্থেটিক বেশি পছন্দ, তাহলে সে স্পর্শ বা হাগ পছন্দ করবে, আপনি তাকে খুশি করতে চাইলে হাগ করতে পারেন।

আবার মনে করেন আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা ভিজুয়ালাইজ করতে বেশি পছন্দ করে, আপনি তার সাথে ভিডিও কল করে কথা বলতে পারেন, বা তার সমানে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।

সেই জন্য প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড, এবং তার কোন ইন্দ্রিয় বেশি ফোকাসড।।

মহিউদ্দীন মাহী
কাউন্সেলর, আইসিডিডিআর,বি
কাউন্সেলর, ডিইউওএস

মন খারাপ মানেই ডিপ্রেশন নয়

প্র: হঠাৎ হঠাৎ মন বেজায় খারাপ হয়ে যায়। ডিপ্রেশনে চলে যাই। কী করি বলুন তো?

উ: মন খারাপ তো হতেই পারে। কিন্তু সেটা মানেই ডিপ্রেশন নয়।

প্র: আরে খুব হতাশ লাগে যে। কিচ্ছু ভাল লাগে না তখন…

উ: কাজকর্ম করতে পারেন?

প্র: সে তো করতেই হবে। কিন্তু মন বিষণ্ণ হয়েই থাকে।

উ: অফিসে বা পরিবারে কোনও সমস্যার জন্য এক-আধ দিন মন বিক্ষিপ্ত বা বিষণ্ণ হতেই পারে। সঙ্গী বিচ্ছেদ হলে বা প্রিয়জনকে হারালে যেমন বেশ কিছু দিন মন খারাপ থাকে। নিজে নিজে ভাল হয়ে যায়। এ রকম মন খারাপ ডিপ্রেশন নয়।

প্র: তবে ডিপ্রেশন কখন?

উ: মন খারাপ যদি একটানা বহু দিন চলতে থাকে, সঙ্গে কাজের ইচ্ছে, ঘুম বা খিদের ইচ্ছে চলে যায় বা কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে না করে, তবে সেটা ডিপ্রেশন। নিজেকে গুটিয়ে নেন অনেকে। কারও কারও এর সঙ্গে মাথা-গা-হাত-পা ব্যথা হতে পারে। সব সময় নিজেকে ছোট করে দেখা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে পারে। নেগেটিভ চিন্তা গ্রাস করতে করতে অনেকের মৃত্যু চিন্তাও আসে।

প্র: এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার।

উ: এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে। কাউন্সেলিং দরকার। প্রয়োজনে ওষুধ।

প্র: আর এই যে যখন তখন মন খারাপ, তার থেকে রেহাই মিলবে কী করে?

উ: আপনাআপনিই কমে যাবে। কোনও ওষুধ লাগবে না। শুধু মন খারাপকে প্রশ্রয় দেবেন না।

প্র: মন তো কেউ এমনি এমনি খারাপ করে না…

উ: দেখুন একটা প্রবাদ চালু আছে। প্রথমবার ডিপ্রেশন হয় প্রিয়জনের মৃত্যুর পর। তার পর ডিপ্রেশন হয় পোষ্য মারা গেলে। তার পর ডিপ্রেশন হয় রুমাল হারালে! আর তার পর থেকে মন খারাপ হতে থাকে এমনি এমনি। এর আর কোনও কারণই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই যে কারণেই মন খারাপ হোক না কেন, প্রশ্রয় দেবেন না। বরং কাজের মধ্যে ডুবে থাকবেন। দেখবেন মন খারাপ হচ্ছে না।

প্র: কিন্তু কাজ মিটলে তো আবার যে কে সেই?

উ: তখন যেটা ভাল লাগে, সেটা করুন। গান শুনুন। বই পড়ুন। বাগানে সময় কাটান। কাউকে ফোন করুন, চ্যাট করুন। অন্য কিছুতে মনকে ব্যস্ত করে ফেলতে হবে।

প্র: মেঘলা দিনেও তো মন খারাপ হয়ে যায়।

উ: আসলে সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি ব্রেনের ফিল গুড কেমিক্যালগুলোকে উজ্জীবিত করে। তাই রোদ না উঠলে মন খারাপ হয়। সে ক্ষেত্রেও একই টোটকা। মনকে ব্যস্ত রাখুন।

প্র: ধরুন অফিসে ব্যাপক ঝামেলা চলছে। তখন?

উ: ঝামেলা যা-ই হোক না কেন, ব্যাপারটা আপনি কী ভাবে নিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে। ধরুন একটা লোক আপনাকে দেখে হাসল, আপনি ভাবতে পারেন আপনাকে টিটকিরি মারল। আবার কেউ ভাবতে পারে লোকটা হয়তো তাঁর পরিচিত…। আপনি কী ভাবে ব্যাপারটাকে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করবে। আর অফিসের যে কোনও ঝামেলার মূলে থাকে উচ্চাশা। কোনও ব্যাপারে সাফল্য না মিললেই মনে হয় সব শেষ। উচ্চাশা নিয়ন্ত্রণে রাখলে মন খারাপ কম হবে।

প্র: তাই বলে উচ্চাশা থাকবে না?

উ: অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেটা না পেলেই সব শেষ তেমনটা যেন না হয়। প্রথমেই ধরতে হবে ব্যাপারটা সাময়িক। এক বার সাফল্য না পেলে যে বার বার তেমনটাই হতে থাকবে তা নয়। নিজেকে বোঝাবেন, আমি এই ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নেব না। আজ হয়নি কাল হবে। যেটুকু পাচ্ছি, সেটাতেই বরং পুরোপুরি মন দিই। ব্যাপারটাকে স্পোর্টিংলি নিতে হবে। এই ভাবে নিজেকে মোটিভেট করতে হবে।

প্র: এগুলো বলতেই সোজা। সমস্যা যখন আসে, তখন…

উ: এক জন কী ভাবে বেড়ে উঠেছে, তার ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে।

প্র: বুঝলাম না…

উ: দেখবেন কিছু বাচ্চা অশান্তির পরিবেশে বড় হয়। সারা দিন হয়তো বাবা-মা ঝগড়া করছে। তাতে বাচ্চাটি ইনসিকিয়োরিটিতে ভোগে। সেটা বড় হয়েও থেকে যায়। আবার অনেক মা’কে বলতে শুনবেন, আমার ছেলে কিচ্ছু লুকোয় না, আমায় সব কথা বলে। ১৭ বছরের ছেলে মায়ের সঙ্গে ঘুমোচ্ছে। বা কলেজে মেয়ে পড়তে যাচ্ছে, মা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে। এ ভাবে বড় হলে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে, এদের স্ট্রেস বেশি হয়। চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কম হয় আর ডিপ্রেশন হয়।

প্র: ধরুন কেউ এ ভাবে বড় হয়েছে। সে চাপ সামলাবে কী করে?

উ: স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা অল্প অল্প করে বাড়াতে হবে। ধরুন কেউ অফিস নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে কোনও কাজ করেন না। সে ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ একটু করতে হবে। প্রয়োজনে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। দরকার মতো ‘না’ বলতে শিখতে হবে। নিয়মিত প্রাণায়াম করলেও স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে। ডায়রি লিখুন। তাতে মনের গ্লানিগুলো পাতায় লিখে ফেললে স্ট্রেস কমে। লাইফ স্টাইল মডিফিকেশন করলেও স্ট্রেস নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে।

প্র: তাহলে মন খারাপও মিটবে?

উ: অনেকটা। আসলে মনের মধ্যে সন্তুষ্টি ব্যাপারটা থাকলে কখনই অসুখী হবেন না। কিন্তু যেটুকু হ্যাপিনেস আছে, সেটাকেই যদি দেখতে না পান, তবে কিন্তু সন্তুষ্টি কিছুতেই আসবে না।

প্র: বয়স্করাও ডিপ্রেশনে ভোগেন

উ: বয়স কালে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নানা সমস্যা হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে একাকীত্ব। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখানো দরকার।

প্র: অবসর নেওয়ার পর তো অনেককেই ডিপ্রেশনে ভোগেন…

উ: হ্যা। আসলে ইনকাম কমে গেল, প্রতিপত্তি কমে গেল। তাই মনে করেন ফালতু হয়ে গেলাম। দেখবেন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলেও মাঝবয়সি মহিলাদের একই সমস্যা হয়। এটা মিডল এজ ক্রাইসিস। সে ক্ষেত্রে আগে ভাগেই রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান তৈরি করতে হবে। নিজস্ব ভাল লাগা তৈরি করতে হবে। পুরনো ভাল লাগাগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ভাবে ভাবতে হবে যে, এত দিন বন্ধন ছিল, তাই কিছু করতে পারিনি। এ বার পেনডিং কাজ করব।

লেখকঃ ডা. অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

মন খারাপ মানেই বিষণ্নতা নয়

কারণে বা অকারণে যে কারও মন খারাপ হতেই পারে। কোনো কিছু নিজের ইচ্ছেমতো হলো না তো মন খারাপ। অফিসের বস ধমক দিয়েছে, মন খারাপ। পরীক্ষায় ভালো ফল হয়নি, মন খারাপ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, তাতেও মন খারাপ।

এই সাধারণ মন খারাপ বা ইংরেজিতে যাকে বলা হয় স্যাডনেস, সেটা কিন্তু বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন নয়। মন খারাপ বা স্যাডনেস হচ্ছে মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ। অন্য দিকে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন হচ্ছে সেই আবেগের অস্বাভাবিক বা দীর্ঘমেয়াদি বহিঃপ্রকাশ। অনেক সময় আমরা মন খারাপকে বিষণ্নতা মনে করে মুষড়ে পড়ি, আবার বিষণ্নতাকে সামান্য মন খারাপ ভেবে গুরুত্ব দিই না। এই দুটো বিষয়ের কিছু পার্থক্য রয়েছে।

দুঃখবোধ একটি মৌলিক আবেগ। সুস্থ মানুষের জীবনে দুঃখবোধ হওয়া এবং মন খারাপ থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘বিষণ্নতা’ বা ‘ডিপ্রেশন’ বলতে যা বোঝায়, তা সাধারণ মন খারাপের চেয়ে কিছু বেশি। বিষণ্নতার ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। শরীর ও মনের ভেতর থেকে এই ‘এন্ডোজেনাস’ বিষণ্নতার উৎপত্তি। আবার কখনো বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে সৃষ্ট দুঃখবোধ যদি অযৌক্তিকভাবে বেশি তীব্র ও দীর্ঘ সময় বিরাজমান থাকে, তখন তাকে বলে ‘রি-অ্যাকটিভ’ বিষণ্নতা।

বিষণ্নতার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান লক্ষণ হচ্ছে মন খারাপ বা দুঃখবোধ বা স্যাডনেস। কিন্তু কেবল এই মন খারাপকেই বিষণ্নতা বলা যাবে না। মন খারাপ আর বিষণ্নতার কিছু পার্থক্য রয়েছে।

বিষণ্নতা একটি আবেগজনিত মানসিক রোগ। দুঃখবোধের মতো সাধারণ আবেগ যখন অযৌক্তিক, তীব্র ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী (কমপক্ষে দুই সপ্তাহ) কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে থেকে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন, কর্মতৎপরতা ও পারস্পরিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করে, তখন সেটাকে বলা হয় বিষণ্নতা। এতে মস্তিষ্কের ‘সেরোটনিন’-জাতীয় রাসায়নিক পদার্থের গুণগত ও পরিমাণগত তারতম্য ঘটে। যে কেউ যেকোনো সময় এতে আক্রান্ত হতে পারে। ধর্ম-বর্ণ, আর্থসামাজিক অবস্থান, যা-ই হোক না কেন, কেউই বিষণ্নতার ঝুঁকিমুক্ত নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ নারী-পুরুষের বিষণ্নতা রয়েছে। যেকোনো বয়সে, এমনকি শিশুদের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে বিষণ্নতার লক্ষণ প্রথমবারের মতো দেখা যায়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর ও ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এর ঝুঁকি কিছুটা বেশি। ডায়াবেটিস, আর্থরাইটিস, শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, মৃগীসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদের বিষণ্নতা রোগ হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, একাকিত্ব, পারিবারিক ও সম্পর্কের সমস্যা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়, বিবাহবিচ্ছেদ, প্রবাসজীবন, অভিবাসন, মাদক সেবন ইত্যাদি কারণেও বিষণ্নতা রোগ হতে পারে।

বিষণ্নতার সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে, কমপক্ষে দুই সপ্তাহজুড়ে দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকা, কোনো কিছু করতে ভালো না লাগা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, হঠাৎ রেগে যাওয়া, আগে যেসব কাজ বা বিনোদন করতে ভালো লাগত, এখন সেগুলো ভালো না লাগা, মনোযোগ কমে যাওয়া, ক্লান্তি বোধ করা, ঘুমের সমস্যা (যেমন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা ঘুম না হওয়া অথবা বেশি ঘুম হওয়া), রুচির সমস্যা (যেমন খেতে ইচ্ছা না করা, খিদে না থাকা বা বেশি বেশি খাওয়া), শারীরিক মিলনস্পৃহা কমে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, সাধারণ বিষয় ভুলে যাওয়া, সব সময় মৃত্যুর চিন্তা করা, নিজেকে অপরাধী ভাবা, আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টা করা ইত্যাদি।

এ ছাড়া কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন কিছু শারীরিক সমস্যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়; বিশেষত নারী রোগীদের মধ্যে, যেমন মাথাব্যথা, মাথায় অস্বস্তি, মাথা-শরীর-হাত-পা জ্বালা করা, গলার কাছে কিছু আটকে থাকা, শরীরব্যথা, ঘাড়ব্যথা, গিঁটে গিঁটে ব্যথা, বুকজ্বলা, বুকব্যথা, নিশ্বাসে কষ্ট ইত্যাদি। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এসব শারীরিক সমস্যার কারণ পাওয়া যায় না। নিজেকে খুব ছোট ও অপাঙ্‌ক্তেয় মনে হতে পারে, উৎসাহ-উদ্দীপনা কমে যায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রবণতা কমে যায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আচরণের অস্বাভাবিকতাও দেখা দিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণের সব কটি একসঙ্গে একজনের মধ্যে সব সময় থাকবে না আবার কয়েকটি লক্ষণ থাকলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে কারও মধ্যে বিষণ্নতা রোগ হয়েছে। বিষণ্নতা রোগ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই সাইকিয়াট্রিস্টের (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) সাহায্য নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা যায়, যাদের বিষণ্নতা রোগ রয়েছে, তাদের শতকরা ৪০ থেকে ৬০ ভাগের আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। মানসম্মত জীবনযাপন ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে দ্রুত বিষণ্নতা শনাক্ত ও চিকিৎসা করা জরুরি।

বিষণ্নতা রোগের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাতারাতি বিষণ্নতামুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য ধৈর্য ধরতে হবে। মনোরোগ চিকিৎসককে সময় দিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে এবং নির্দেশমতো ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

মন খারাপ

• মন খারাপ কোনো রোগ নয়। একটি মৌলিক আবেগ। যেকোনো ক্ষতি বা আঘাতের পর মন খারাপ বা দুঃখবোধ একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

• সাধারণত ক্ষণস্থায়ী।

• বেশির ভাগ সময়ই মন খারাপের কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।

• মন খারাপের জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

• মন খারাপের কারণে কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায় না।

• মন খারাপের তীব্রতা কম।

• নারী-পুরুষ উভয়েরই মন খারাপ হওয়ার ঝুঁকি সমান।

• মন খারাপ হলে সাধারণত শারীরিক লক্ষণ থাকে না।

বিষণ্নতা

• বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন আবেগজনিত একটি মানসিক রোগ।

• সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী। বিষণ্নতা রোগে মন খারাপ, কোনো কাজে আগ্রহের অভাব, কিছু শারীরিক লক্ষণ কমপক্ষে দুই সপ্তাহ থাকে।

• বিষণ্নতার কারণ সব সময় জানা যায় না, কখনো কারণ থাকেও না।

• বিষণ্নতা রোগের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।

• বিষণ্নতার কারণে কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়।

• বিষণ্নতার তীব্রতা বেশি।

• নারীদের মধ্যে বিষণ্নতা রোগ হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ।

• বিষণ্নতা রোগে বেশ কিছু শারীরিক লক্ষণ, যেমন ঘুমের সমস্যা, রুচির সমস্যা, ক্লান্তিবোধ, শরীরে ব্যথা ইত্যাদি দেখা যায়।

লেখকঃ আহমেদ হেলাল, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
সূত্রঃ প্রথম আলো

আপনার বিষণ্ণতা হয়েছে কীনা তা কীভাবে বুঝবেন?

বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ঢাকা পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে শিশু কিশোরদের আঠার শতাংশের বেশি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে বড় সংকটের তৈরি করতে যাচ্ছে এই বিষণ্ণতা।

গবেষক ও চিকিৎসকরা মনে করে সাধারণভাবে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তার জীবদ্দশায় কখনো না কখনো বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন বা হতে পারেন।

বিষণ্ণতা আসলে কি?

বিষণ্ণতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ শুরুতেই এর প্রতি যথাযথ দৃষ্টি না দিলে এ থেকে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।

মনঃচিকিৎসক মুনতাসীর মারুফ বলছেন বিষণ্ণতায় আক্রান্তদের মধ্যে পনের শতাংশের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়ে থাকে।

তবে বিষণ্ণতা বলতে অনেকে মন খারাপকে বুঝে থাকেন।

মনোবিদ ডা: মেখলা সরকার বিবিসিকে বলছেন বিষণ্ণতা মানুষের মনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। একজন মানুষের কোনো বিষয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া বা এ ধরণের নানা কারণে মন বিষণ্ণ হতেই পারে।

“কিন্তু যখনি রোগ হবে সেটা একটু ভিন্ন। বিষণ্ণতা হতে পারে বিভিন্ন মাত্রা কিংবা গভীরতায়। মনে রাখতে হবে টানা দুই সপ্তাহ মন খারাপ থাকা বা আগে যেসব কাজে আনন্দ লাগতো সেসব স্বাভাবিক কাজগুলোতে আনন্দ না পাওয়ার মতো হলে এটিকে বিষণ্ণতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

ডা: মুনতাসীর মারুফ বলছেন একজন মানুষের মধ্যে যে কোনো আবেগ গত পরিবর্তন অনেক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে এবং সেটা দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করছে তখনি আপনাকে সতর্ক হওয়া উচিত।

বিষণ্ণতার লক্ষণ কোনগুলো

আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক এসোসিয়েশন বিষণ্ণতার নয়টি লক্ষণ উল্লেখ করে বলেছে কারও মধ্যে এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি টানা দু সপ্তাহ বা তারচেয়ে বেশি সময় দেখা গেলে সেটি বিষণ্ণতা হতে পারে।

এগুলো হলো:

• দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকা
• যেসব কাজে আনন্দ পেতো সেসব কাজে আনন্দ ও আগ্রহ কমে যাওয়া
• ঘুম অস্বাভাবিক কম বা বাড়তে পারে
• খাবারে অরুচি তৈরি হওয়া বা রুচি বেড়ে যাওয়া
• ওজন কমে যাওয়া
• কাজে ও চিন্তায় ধীরগতি হয়ে যাওয়া
• নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করা বা নিজেকে দায়ী মনে হওয়া সবকিছুতে
• সিদ্ধান্তহীনতা বা মনোযোগ কমে যাওয়া এবং খুব তীব্র হলে আত্মহত্যার চিন্তা পরিকল্পনা ও চেষ্টা করে

ডা: মেখলা সরকার বলছেন প্রতিক্রিয়া দুভাবে হতে পারে যেমন ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রে কারও ঘুম কমে যেতে পারে আবার কারও ঘুম বেড়েও যেতে পারে, আবার কারও ছাড়াছাড়া ঘুম হতে পারে।

“আবার দেখা যাচ্ছে ঘুম হচ্ছে কিন্তু ঘুম থেকে যে শক্তি আসার কথা শরীরে তা না এসে উল্টো ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে। সেটিও বিষণ্ণতার লক্ষণ হতে পারে।”

তিনি বলেন অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের স্বাদে পরিবর্তন হয়। ফলে খাবার বেড়েও যেতে পারে, তেমনি আবার কমেও যেতে পারে কিন্তু সব মিলিয়ে শরীরের ওজন কমে যায় অনেকের ক্ষেত্রে। কেউবা আবার মুটিয়ে যায়।

“বিষণ্ণতার কারণে হতাশা বোধ হয়। মনে হয় যে সামনে ভালো কিছু নেই। নিজের সব কিছু নেতিবাচক মনে হতে পারে। তার দ্বারা ভালো কিছু হবেনা মনে হয়। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস কমে যায়। আর এসব তার দৈনন্দিন জীবনাচরণে প্রভাব ফেলে”।

এর বাইরেও কিছু লক্ষণের কথা চিকিৎসকরা বলে থাকেন যার মধ্যে রয়েছে- নানা ধরণের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়া, হাত পা জ্বালা পোড়া করা, কান দিয়ে গরম ধোয়া বের হওয়ার অনুভূতি কিংবা ভীষণ মাথা ধরা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য।

মেখলা সরকার বলেন আসলে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে জীবন ধারণ বোধটাই কঠিন হয়ে যেতে থাকে যেটি ব্যক্তির মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট বয়স আছে?

ডা: মেখলা সরকার বলছেন যে কোনো বয়সেই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

“প্রাপ্ত বয়স্কদেরই বেশি দেখা দেয়। তবে যে কোনো বয়সী মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারেন পারিপার্শ্বিক নানা কারণে।”

জেলা পর্যায়ে একটি হাসপাতালে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে ডা: মুনতাসীর মারুফ বলছেন প্রাপ্ত বয়স্কদের অনেকেই হাসপাতালে আসেন নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে।

“কিন্তু যখনই একটু ডিটেইলসে যাওয়ার চেষ্টা করি তখন দেখতে পাই শারীরিক সমস্যা আসলে নেই। সমস্যাটা মানসিক এবং বিষণ্ণতা থেকে এগুলো হচ্ছে।”

তবে শিশু কিশোরদের মধ্যে নানা কারণে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হবার সুযোগ বেশি।

যেমন প্রেমে ব্যর্থতার কারণে অনেকে এই সমস্যায় আক্রান্ত হন তাই এ ধরণের ক্ষেত্রে শিশু কিশোরদের মানসিক সহায়তা জরুরি বলে মনে করেন মিস্টার মারুফ।

কেনো মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়?

মনোবিদ মেখলা সরকারের মতে অনেকগুলো কারণের মধ্যে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীনগত ত্রুটি।

“জেনেটিক কারণে অনেকে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিবেচনায় রাখা দরকার বায়োলজিক্যাল অসুখ বিসুখকে। এছাড়া নেতিবাচক মানসিক গঠন। কিংবা আশপাশের পরিবেশ যা সে মনে করে যে তার সাথে আর যাচ্ছেনা”।

তিনি বলেন আবার ব্রেক আপ, ডিভোর্স কিংবা পরিবারের কেউ অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে সেখান থেকেও বিষণ্ণতা হওয়ার আশংকা থাকে।

আবার চারপাশে সব ঠিক আছে কিন্তু তারপরেও জৈবিক বা অন্তর্গত নানা কারণে একজন মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে।

বিষণ্ণতা কাটানোর উপায় কি?

মেখলা সরকারের মতে বিষণ্ণতা তিন ধরণের হয়- মৃদু, অল্প বা বেশি।

“মৃদু বিষণ্ণতা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। আবার অল্প হলে কারও সাথে শেয়ার করা বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ালে কাজে লাগে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন না থাকা। সবার সঙ্গে মেশা। যাদের সঙ্গ ভালো লাগে তাদের কাছে থাকা। মানুষের কাছ থেকে দুরে সরে না যাওয়ার মাধ্যমেও কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।”

তিনি বলেন বিষণ্ণতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে করে।

“এজন্য আমরা বলি শারীরিক পরিশ্রম বা শরীরচর্চা করা। রেগুলার ৩০ মিনিট হাঁটা খুবই ভালো। কেউ বাইরে যেতে নর পারলে ঘরের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে পারে তাতেও উপকার পাবে।”

তিনি বলেন একজন মানুষ যতোটা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকবে ততটাই তার সমস্যা কাটবে।

“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকভাবে দৃঢ় থাক ও আত্মবিশ্বাস রাখা যে আমি পারবো। এজন্য নিজের ইতিবাচক বিষয়গুলোকে ফোকাস করা যেতে পারে এবং ভালো কাজগুলোর চর্চা করা।”

তবে দৈনন্দিন জীবন যাপনের কাজ কিংবা পড়ালেখা বা পরিবারের সাথে সম্পর্ক খারাপ হতেই থাকলে বা কেউ যদি ক্রমাগত নিজে গুটিয়ে নিচ্ছে মনে হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে বিষণ্ণতা অনেকটাই নিরাময়যোগ্য তাই একে অবহেলা করা উচিত হবেনা।

একই মত দিয়ে ডা: মুনতাসীর মারুফ বলেন বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী জীবনাচরণ পরিচালনা করতে পারলে এ থেকে সহজেই উত্তরণ করা সম্ভব।

লেখক : রাকিব হাসনাত
সূত্র : বিবিসি বাংলা

স্যাডনেস না ডিপ্রেশন? পার্থক্য করবেন কিভাবে?

শান্তনুর প্রিয় মোবাইলটি দুই দিন হলো হারিয়ে গেছে। আবার কিছু দিন হলো তার কাছের এক বন্ধু মারা গেছেন। সেজন্য শান্তনুর মন অনেক খারাপ এবং খুব কষ্ট পাওয়ার কারণে কান্নাও করছে, সারাদিন কিছু খাওয়া-দাওয়া করেনি, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না কারো সাথে, ঘুম আসছে না, ঠিক মতো ঘুমাতেও পারছে না, মোবাইল হারানোর কষ্টটা ভুলতে পারছে না, আবার বন্ধুর স্মৃতিগুলোও মনে পড়ছে, ইত্যাদি সমস্যাগুলো হচ্ছে।

এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এটা কি Sadness or Depression? পার্থক্য করবেন কিভাবে?

SADNESS ও DEPRESSION কী?

SADNESS:

১. Sadness মানুষের খুব সাধারণ একটি আবেগ বা অনুভূতি, যা সবারই হয়।

২. এটা বিশেষ কোনো ঘটনা বা বিষয়কে কেন্দ্র করে হয়।

৩. বেশিদিন স্থায়ী হয় না, সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়।

৪. মন খারাপ থাকলেও আনন্দের বা পছন্দের ব্যাপারগুলো ভাল লাগে, যেমন: গান শুনলে বা প্রিয় বন্ধুর সাথে আড্ডা দিলে মন কিছুটা হলেও ভালো হয়।

৫. দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে খুব একটা সমস্যা হয়না।

৬. আত্মহত্যার চিন্তা আসে না।

Sadness কোন মানসিক অসুখ নয়। সাধারণত কোন চিকিৎসার দরকার হয় না। তবে এটা যদি বেশি দিন থাকে এবং এর কারণে যদি দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে সমস্যা হয় তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

DEPRESSION:

১. Depression একটি মানসিক অসুখ।

২. বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো কারণ ছাড়াই হয় । তবে শারীরিক কোন অসুখ বা কষ্টকর কোন লাইফ ইভেন্ট, জেনেটিক ইত্যাদি কারণেও শুরু হতে পারে।

৩. এর লক্ষণ সমূহ : সব সময় মন খারাপ থাকা, কোন কিছু করতে ইচ্ছা করে না বা ভালো লাগেনা, ঘুমের সমস্যা, খাদ্যে অরুচি, ওজনের পরিবর্তন হওয়া, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা, নিজেকে অকর্মণ্য মনে করা বা অতি মাত্রায় দোষী মনে করা, মনোযোগের অভাব, খুব ক্লান্তি বোধ করা,আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করা।

এই লক্ষণগুলোর মধ্যে যেকোনো পাঁচটি বা তার বেশি কমপক্ষে ১৪ দিন বা তার বেশি সময় ধরে থাকে ।

৪. আনন্দের কোন কাজই করতে ভালো লাগেনা বা এর দ্বারা মন ভালো করা সম্ভব হয় না।

৫. দৈনন্দিন কাজ করা , কারো সাথে আড্ডা দেওয়া , পেশাগত কাজ, বাড়ির ভিতরে বা বাইরে সব অবস্থাতেই মন একই রকম থাকে। শান্তি লাগেনা।

৬. অনেক সময় পূর্বে এরকম সমস্যায় ভুগেছেন-এরকম যদি ইতিহাস থাকে।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়

১. মেডিসিন
২. সাইকোথেরাপি/Cognitive Behavior Therapy (CBT)

ডিপ্রেশন আপনাকে অসহায় অবস্থায় পতিত করবে। ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ধরণের থেরাপি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেকেও প্রস্তুত করতে হবে। নিজের চেষ্টা না থাকলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নিজের প্রতিদিনের কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া, জীবনযাত্রা এমনকি চিন্তা-ভাবনায় ও পরিবর্তন আনতে হবে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য নিচের পয়েন্টগুলো সহায়ক হতে পারে-

১. রুটিনমাফিক চলা

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনের জীবনকে একটা রুটিনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিদিনের কাজ-কর্মকে যদি একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলা যায় তবে তা ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।

২. লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা

লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। ডিপ্রেশনে যেহেতু কোন কাজ করতে ইচ্ছা করে না তাই প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

ধরা যাক, প্রথম দিন আপনি ঠিক করলেন আপনি আজ একটা মজার কিছু রান্না করবেন। যদি আপনি সেই কাজটা ঠিক মত করতে পারেন তবে পরের দিন আর একটু বেশি কিছু করার কথা চিন্তা করতে হবে। এভাবে ধীরে ধীরে কাজের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে এক সময় ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

৩. নিয়মিত ব্যায়াম করা

প্রতিদিন অল্প কিছু সময় ব্যায়াম করলে তা আপনার শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখবে। ব্যায়াম করা মানে, ম্যারাথন দৌড় টাইপ কিছু না, আপনি যদি প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটাহাটি করেন তবুও তা আপনার মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যা আপনাকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করবে।

৪. সুষম খাদ্য গ্রহণ

সুষম খাদ্য গ্রহনের মাধ্যমে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকে। সাইক্রিয়াটিস্টদের মতে, যেসব খাবারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এ্যাসিড এবং ফলিক এসিড থাকে সেসব খাবার ডিপ্রেশন কমাতে সহায়তা করে।

৫. অনিদ্রা দূর করা

পর্যাপ্ত ঘুম ডিপ্রেশন কমায়। ডিপ্রেশনের রোগীদের নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়। তাই, প্রথমেই ঘুম সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে নিদ্রাহীনতা দূর করা সম্ভব। প্রতিদিন ঠিক সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দিনের বেলার হালকা ঘুমের অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। শোবার ঘর থেকে টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল এগুলো সরিয়ে রাখতে হবে। এভাবেই অনিদ্রা রোগ ধীরে ধীরে দূর করা সম্ভব।

৬. ইতিবাচক চিন্তা করা

ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকলে মানুষের মনে বিভিন্ন রকম নেগেটিভ চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। যেমন, আমিই বুঝি সবচেয়ে খারাপ, আমার মত দুঃখ কারো নেই, আমি সবার চেয়ে অসুস্থ, আমি ব্যর্থ একজন মানুষ, আমার দ্বারা কিছু সম্ভব না, আমার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কী করব জীবনে বেঁচে থেকে- এই ধরণের চিন্তাগুলো সুস্থ হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই, এই নেগেটিভ চিন্তাগুলোকে মন থেকে দূর করে পজিটিভলি চিন্তা করার চেষ্টা করতে হবে। যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে হবে। কোনোভাবেই আশাহত হওয়া যাবে না।

৭. আনন্দদায়ক কাজের মধ্যে সময় কাটানো

নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। মজার কোন কাজ। যেমন, নতুন কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মজার কোন বই পড়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া। মন ভালো রাখার সবরকম চেষ্টা করতে হবে। মন ভালো থাকলে ডিপ্রেশন কেটে যাবে একসময়।

৮. Psychiatrist ও সাইকোলজিস্টের পরামর্শ গ্রহণ

ডিপ্রেশন পুরোপুরি ভালো না হওয়া পর্যন্ত পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

সর্বশেষ শুধু এইটুকু বলতে চাই, Depression অনেকদিন ধরে স্থায়ী হয়। সুস্থ হতে হলে অবশ্যই সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয় (যেমন: ওষুধ, কাউন্সিলিং বা সাইকোথেরাপি ইত্যাদি) এবং সময়েরও।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

রোগ যখন ভুলে যাওয়া

Dewar Babu মুভিটি দেখেছেন কখনো? খুবই জটিল প্রেমের মুভি। কিন্তু কিছু দূর কাহিনী চলার পরই ‘টুইস্ট’ চলে আসে। মুভির নায়ক এক ভয়ংকর এক্সিডেন্টের শিকার হন এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পান। জ্ঞান ফেরার পর তার প্রথম ডায়লগ ছিলো “আমি কে? আমি কোথায়? আপনারা কারা?” এ কথা শুনে নায়কের আত্মীয়-স্বজন অনেক ব্যথিত হন এবং নায়িকা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন ডাক্তার এসে জানালেন, রোগীর Amnesia হয়েছে।

এসব দৃশ্য দেখে এমন মনে হতেই পারে যে, মাথায় আঘাত পেলে অ্যামনেশিয়া হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আর এটা হলে ব্যক্তি তার নাম ঠিকানা ভুলে যায়। নিজের কোনো কাজকর্ম করতে পারে না, আগে যা পারতো তার কিছুই মনে থাকে না।

অ্যামনেশিয়া হলো ভুলে যাওয়া, স্মৃতি বিলোপ, তথ্য ঘটনা, অভিজ্ঞতার হ্রাস পাওয়া। Amnesia is a deficit in memory caused by brain damage or disease, but it can also be caused temporarily by the use of various sedatives and hypnotic drugs. The memory can be either wholly or partially lost due to the extent of damage that was caused. [Source : Wikipedia]

কিন্তু বাস্তবে এভাবে মাথায় আঘাত পেয়ে সব কিছু ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এটি সত্যি যে মাথায় আঘাত পেলে স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী হয়। যেমন: Anterograde Amnesia হলে মানুষ নতুন তথ্য মনে রাখতে পারে না। আবার, Retrograde Amnesia তে দূর্ঘটনার আগের স্মৃতি মনে থাকে না।আর মুভিতে দেখানো সমস্ত স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নাম Transient Global Amnesia (TGA), যা খুবই বিরল একটি অসুখ।

এছাড়া Neurology and Clinical Neuroscience ও Encyclopedia of Neuroscience অনুসারে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মধ্যে বয়স্ক থেকে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই (গড়ে ৪-৬ ঘন্টা) তার স্মৃতি ফিরে পায়। [Source : Google]

রোগের কারণ

বিভিন্ন রোগের কারনে অ্যামনেশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ হতে পারে। যেমন, এইডস, দীর্ঘমেয়াদী ধূমপান ও মদ্যপান, আলকোহল, ভিটামিন বি’এর অভাব, কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া, মস্তিষ্কের রোগ এবং অনৈতিক জীবনযাপন, মস্তিষ্কে আঘাত, স্ট্রোক, ব্রেন টিউমার, মস্তিষ্কে অপর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রবাহ, মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত ইত্যাদি।

লক্ষণ

অ্যামনেশিয়ার প্রাথমিক বিস্তার খুবই ধীরে হয়, এমনকি মাস কিংবা বছর ধরেও হতে পারে। ভুলে যাওয়ার কারণে রোগী হতাশা, নিদ্রাহীনতা ও অন্যান্য সমস্যায় ভোগে এবং আস্তে আস্তে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তবে অ্যামনেশিয়া যে ধরনেরই হোক না কেন, তাতে সাধারণত আমাদের Declarative Memory অর্থাৎ তথ্য ও ঘটনার স্মৃতি, আমাদের Procedural Memory অর্থাৎ কোনো অভ্যাস বা কাজের কৌশলের স্মৃতির চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ কেউ প্রথম কবে, কার কাছে সাইকেল চালানো শিখেছে তা ভুলতে পারে কিন্তু কীভাবে সাইকেল চালাতে হয় তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

সেই সাথে অ্যামনেশিয়া তে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের Long Term Memory, অর্থাৎ ছোটবেলার স্মৃতি। এবং সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যখন স্মৃতি ফিরে আসে, তখন সবার আগে সেই স্মৃতি গুলোই ফিরে আসে।

ভুলে যাওয়া রোগ থেকে মুক্তির কিছু উপায়

কয়েক দিন আগেই হয়ত দেখা হয়েছিল কোন একজনের সঙ্গে। কথাও হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ মনে করতে গিয়েও কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। কোন একটা জিনিস হয়ত খুব যত্ন করে তুলে রেখেছেন কোথাও। কিন্তু কাজের সময় কিছুতেই আর মনে করতে পারছেন না যে কোথায় রেখেছেন। এরকম হতে থাকলেই অনেকে ভয় পান। ভাবেন, এই বুঝি অ্যামনেশিয়ার পূর্বলক্ষণ। কিন্তু সত্যিই কি তাই!? এত গুরুতর কিছু, নাকি ছোটখাটো অবহেলার কারণেই এই অবস্থা? ভুলে যাওয়ার রোগ মানেই বড় অসুখ নয়। বরং ছোটখাট কিছু জিনিস খেয়াল রাখলেই এর প্রতিকার মেলে। এ থেকে মুক্তি পেতে মেনে চলতে হবে কিছু উপায়:

• শব্দ নিয়ে খেলা শব্দ নিয়ে খেলতে থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভবনা কমে। ধরুন ই-মেইলের পাসওয়ার্ডের ক্ষেত্রে এমন একটা পাসওয়ার্ড দিলেন, যার এক একটা অক্ষর এক একটি শব্দের আদ্যাক্ষর। আর সবগুলো মিলিয়ে একটা বাক্য, যা হয়ত আপনার জীবনের খুব প্রিয় কোন ঘটনাকে বর্ণনা করছে। এরকম পাসওয়ার্ড থাকলে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খবুই কম। এটিএম পিনের ক্ষেত্রেও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যা ব্যবহার করা যেতে পারে।

• লিখে ফেলা কোন দরকারি জিনিস চট করে কোথাও লিখে রাখুন। পরে যদি হাতের কাছে লেখা কাগজটি নাও পান, তবু কী লিখেছেন মনে করতে গিয়ে অনেক সময় আসল জিনিসটা মনে পড়ে যায়। পড়ার পর ছাত্রদের ঠিক যে কারণে লিখতে বলা হয় এখানেও সেই একই যুক্তি কাজ করে। লেখার এই অভ্যাস ভুলে যাওয়ার হাত থেকে আপনাকে বাঁচাবে।

• স্মৃতিকে চ্যালেঞ্জ করুন আসলে চ্যালেঞ্জ জানান মস্তিষ্ককে। ক্রসওয়ার্ড পাজল খেললে এরকম মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়। এতে অনেক ভুলে যাওয়া জিনিসও মনে পড়ে যায়।

• বারবার এক জিনিস বলা, ধরা যাক নতুন কোন নাম বা ঠিকানা আপনাকে মনে রাখতে হবে। সেই শব্দটি বারবার করে বলতে থাকুন। এক কথা বারবার বললে তা মনে থাকতে বাধ্য।

• স্মৃতিভ্রংশের জন্য অনেকাংশেই দায়ী লাইফস্টাইল। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে কোলেস্টেরল, ব্লাড প্রেসার ও ব্লাড সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা হয় এবং স্মৃতিশক্তিও কমে যায়। চর্বি ও স্নেহপদার্থ জাতীয় খাবার যারা বেশি খান তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যেতে পারে। সুতরাং জীবনযাপনের ধরণ বদলালে এ থেকে মুক্তি মিলতে পারে।

• ধূমপানে নিকোটিন জমা হওয়ার ফলে রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রভাব পড়ে স্মৃতিশক্তিতে। অন্যদিকে যারা মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করেন তাদের ক্ষেত্রেও স্মৃতিভ্রংশ রোগ দেখা দেয়। ফলে এ দুটো বিষয় যত এড়ানো যায় ততই মঙ্গল। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও ভুলে যাওয়ার রোগ দেখা যায়।

চিকিৎসা

ডাক্তারের নির্দেশমতো কিছু কিছু ওষুধ রোগীর চিন্তাশীলতা ও শনাক্তকরণ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যামনেশিয়া রোগটি জটিল হয়ে গেলে রোগীর সেরে ওঠার আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

যদি আপনার এধরনের সমস্যা থাকে তাহলে খুব দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

লেখক: আনিকা তাবাসসুম, বিএসসি অনার্স, মনোবিজ্ঞান (অধ্যয়নরত)

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবেন যেভাবে

রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা সব মানুষের মধ্যে কমবেশি রয়েছে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হলো বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা মানুষের জৈবিক গঠন, মানসিক গঠন ও সামগ্রিক মনোদৈহিক প্রক্রিয়ার ভেতর অন্তর্নিহিত থাকে। মানুষ যেহেতু শরীর ও মনের পারস্পরিক সমন্বয়, সেহেতু আমাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একই সঙ্গে কাজ করে।

মারাত্মক ছোঁয়াচে, প্রাণঘাতী হওয়ায় নতুন করোনাভাইরাস আমাদের স্বাভাবিক জীবন ও জীবনব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ভাইরাস আমাদের শুধু শারীরিক দিক দিয়ে আক্রমণ করছে না, বরং মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে ফেলছে।

বর্তমান সময়ে আমাদের মধ্যে খুব সংগত কারণেই নানা ধরনের উদ্বেগ, ভয়ভীতি, বিষণ্নতা, শূন্যতা ইত্যাদি নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগ কাজ করছে। এই সব নেতিবাচক অনুভূতি, আবেগ ও চিন্তাকে এড়িয়ে না চলে, প্রত্যাখ্যান না করে, এগুলোর সঙ্গে একাত্মতা জ্ঞাপন না করে এবং সর্বোপরি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে বরং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে এগুলোকে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ করা ও সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একজন মানুষকে মানসিক চাপ, ভয়, অনিশ্চয়তা, হীনমন্যতা ও নেতিবাচক চিন্তাধারার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে শক্তি দেয় এবং মনের ওপর এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে এনে মানসিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে।

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যা করা যেতে পারে:

১. পরিস্থিতি দেখে পলায়নপর হবেন না কিংবা এড়িয়ে যাবেন না

আমরা সাধারণত যেকোনো ধরনের বেদনাদায়ক ও কষ্টদায়ক উদ্দীপক এবং পরিবেশ থেকে মুক্তি চাই কিংবা এড়িয়ে যেতে চাই। পলায়নপর এই প্রবণতা অনেক সময় নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে। কারণ, বাস্তবতা যতই প্রতিকূল হোক না কেন, তাকে অস্বীকার করে সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বরং উল্টো বিভিন্ন মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তাই বর্তমান করোনা সংকটকে এড়িয়ে না গিয়ে বরং চলমান জীবনের একটা অংশ হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে প্রথমেই। সেখান থেকে একটি ইতিবাচক অর্থ তৈরি করার মাধ্যমে আমরা মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারি।

২. কোনো ধরনের আবেগকে নিজের আত্মপরিচয়ের অংশ মনে করবেন না

অনিশ্চয়তার কারণে আমাদের মধ্যে ভয়, উদ্বিগ্নতা কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সব ভয় ও উদ্বিগ্নতাকে নিজের ব্যক্তিত্বের এবং আত্মপরিচয়ের অংশ মনে করবেন না। অর্থাৎ, বিদ্যমান ভয় ও উদ্বিগ্নতা মানেই আপনি নন। এই ধরনের ভয় ও উদ্বিগ্নতা হলো পূর্ব অভিজ্ঞতাবিহীন ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির প্রতি আপনার শরীর ও মনের স্বয়ংক্রিয়, ক্ষণস্থায়ী ও স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাই এগুলোকে মন থেকে দূর করার চেষ্টা না করে শান্তভাবে মেনে নিতে হবে এবং সেগুলোর ওপর কোনো ধরনের ব্যক্তিগত অর্থ আরোপ না করে নিজেকে আনন্দদায়ক বা বাড়ির দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। এতে বিদ্যমান ভয় ও উদ্বিগ্নতার প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যাবে।

৩. নিজের অক্ষমতা স্বীকার করুন

এই সময় মনের মধ্যে বিপর্যয়মূলক বিভিন্ন চিন্তা আসতে পারে। যেমন: প্রিয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে কি না, চাকরি চলে যাবে কি না, পরিবার ও আত্মীয়স্বজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে কি না। বিপর্যয়মূলক চিন্তা এলে সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে এটাও চিন্তা করতে হবে যে আমাদের জীবনের সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সুতরাং এই অক্ষমতাটুকু অকপটে স্বীকার করে বিপর্যয়মূলক চিন্তাগুলোকে বাধা না দিয়ে বরং পরিবর্তনের স্বাভাবিক ইঙ্গিত হিসেবে সম্মান করার চেষ্টা করুন। এতে প্রিয় ও অপ্রিয় সবকিছুকে সাদরে গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়বে। একসময় দেখবেন বিপর্যয়মূলক চিন্তাগুলো আপনার মনের ভেতর বারবার ঘুরপাক খাওয়া নিজ থেকেই বন্ধ করে দেবে।

৪. অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমান নিয়ে ভাবুন

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর আরেকটি কার্যকর উপায় হলো নিজের মনকে অতীত ও ভবিষ্যতের দিকে না পাঠিয়ে বর্তমানের চলমান মুহূর্তের ভেতর ধরে রাখার চেষ্টা করা। এটা একটু কঠিন। কারণ, আমাদের মন সব সময় অতীত চিন্তা ও কিছুক্ষণ ভবিষ্যৎ চিন্তার ভেতর লাফালাফি করে। মন যখন অতীতের কোনো বিষয়ের প্রতি বেশি একাত্ম হয়ে যায়, তখন আমাদের ভেতর বিষণ্নতা তৈরি হয়। আর যখন ভবিষ্যতের প্রতি বেশি একাত্ম হয়ে যায়, তখন আমাদের ভেতর উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়। মাত্রাতিরিক্ত অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা অপরাধ বোধ ও আতঙ্ক তৈরি করে। তাই মানসিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমাদের মনকে সব সময় আমাদের দেহের ভেতর রাখতে হবে। কারণ, আমাদের দেহ সব সময় বর্তমানেই বাস করে।

যখন যে কাজটা করছি, তখন মনকে ঠিক ওই কাজের ভেতর আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ রেখে অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় তলপেটের যে ওঠা-নামা হয়, সেটার প্রতি মনোযোগ রেখে প্রতিদিন সকালে, বিকেলে ও রাতে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট করে ধ্যান করার চেষ্টা করুন। কারণ, ধ্যান আপনার মনকে বর্তমানের মধ্যে ধরে রাখার সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দেয় এবং আপন মনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানান দেয়।

৫. স্বজনদের সঙ্গে অকৃত্রিম বন্ধন তৈরি করুন

পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া–প্রতিবেশীর সঙ্গে অকৃত্রিম বন্ধন তৈরি করা এবং বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইতিবাচক সম্পর্ক মনকে সব সময় সতেজ রাখে এবং মনের পজিটিভ এনার্জি বাড়িয়ে দেয়।

যতটুকু সম্ভব মানুষকে আন্তরিকভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করতে হবে। এতে মানুষের সঙ্গে মানুষের একাত্মতা বাড়ে। একাত্মতা মানুষের একাকিত্বের অনুভূতি দূর করতে সাহায্য করে।

৬. সৃজনশীল হোন

প্রতিদিন ছোটখাটো কোনো সৃজনশীল কাজ করার চেষ্টা করতে হবে। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। পারিপার্শ্বিক চাপ মোকাবিলার কৌশল হিসেবে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য ও মাত্রাতিরিক্ত চা-কফি পান করা যাবে না। যেসব বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে, সেই সব উৎসকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চিহ্নিত করতে হবে। মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী যেসব উপাদান বর্তমানে মোকাবিলা করা সম্ভব, সেগুলোকে যৌক্তিক মন দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। আর যেসব উপাদানকে আপাতত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেগুলো চিন্তার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে এবং এড়িয়ে চলতে হবে। এতে আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়বে।

৭. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

সঠিক সময়ে দৈনিক কমপক্ষে আট ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক ও শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত স্নান করা, নিজের কাপড়চোপড় নিজে ধোয়া, নিজের রুম নিজে পরিষ্কার করার অভ্যাস করতে হবে। বাড়ির কাজে অন্যকে সাহায্য করতে হবে, যা আপনার একটি দিনকে অর্থপূর্ণ করতে সাহায্য করবে। সেই সঙ্গে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর খাবার ও দেশি ফলমূল নিশ্চিত করতে হবে এবং অল্প সময়ের জন্য হলেও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

সব শেষে নিজের প্রতি, ভবিষ্যতের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অনুশীলন করতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ ও প্রকৃতিকে বন্ধু বলে মেনে নিতে হবে।

লেখক: লিটন বড়ুয়া, মনোবিজ্ঞানী ও একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত
সূত্র: প্রথম আলো